জাতীয় মাছ

ইলিশের সাতকাহন

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

দেশের নদনদী এবং বঙ্গোপসাগরের জলসীমা ১৪ অক্টোবর থেকে জেলেশূন্য। মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করার জন্য ওই দিন থেকে ২২ দিন ইলিশ নিধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু ইলিশ নিধন নিষিদ্ধ হলেও নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে অন্য মাছ ধরার অজুহাতে ইলিশ নিধনের সুযোগ নিতে না পারেন জেলেরা। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে ২২ দিন ইলিশ নিধন নিষিদ্ধ, তা সবাই জানলেও এর নেপথ্যের কারণগুলো সবার কাছে অজানা। সমকাল পাঠকদের জন্য সেগুলো ব্যাখ্যা করেছেন ইলিশ নিয়ে গবেষণাকারী একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান চাঁদপুর ইলিশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আনিছুর রহমান।
ইলিশের মায়ের দেশ বাংলাদেশ
পৃথিবীর বিশাল জলসীমার মধ্যে বাংলাদেশের অংশটুকু মাতৃভূমির মতো বেছে নিয়েছে ইলিশ। এর কারণ হিসেবে ড. আনিছুর রহমান বলেছেন, আমাদের দূষণমুক্ত নদনদীর মিঠাপানির সব গুণাগুণ ইলিশ বসবাসযোগ্য। যে কারণে ইলিশ গভীর সাগর থেকে ভারত কিংবা মিয়ানমারের নদীর দিকে না গিয়ে বাংলাদেশের নদীতে প্রবেশ করে। ইলিশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যেখানে তাদের জন্ম হয়, ডিম ছাড়ার জন্য তারা সেখানেই চলে আসে।
এর যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, এ বছর মেঘনায় যে ইলিশের জন্ম হবে, সেটি কিছুটা পরিণত হওয়ার পর পরিপূর্ণ হতে গভীর সাগরে চলে যাবে। পরিণত বয়সে পেটে ডিম এলে প্রজননের জন্য সাগর ছেড়ে আবার মেঘনাতেই চলে আসবে ওই ইলিশটি। এসব কারণে বাংলাদেশের নদনদীতে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যায়।
২২ দিন নিষিদ্ধ কেন আশ্বিনে?
এ প্রসঙ্গে ড. আনিছুর রহমান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশ সারা বছর ডিম দিলেও ৮০ ভাগ ইলিশের পেটে ডিম আসে আশ্বিন মাসে। পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় সাগরের পানি ফুলে উঠলে নদীতেও পানি বৃদ্ধি পায়। বেশি পানিতে ইলিশের ঝাঁক অনায়াসে সাঁতরে নদীতে চলে আসতে পারে। এসব হিসাব-নিকাশে প্রতি বছর আশ্বিনের পূর্ণিমা-অমাবস্যার আগে-পরে মোট ২২ দিন ইলিশ নিধন নিষিদ্ধ করা হয়, যাতে নিরাপদে নদীতে প্রবেশ করে ডিম ত্যাগ করতে পারে। এ বছর ১৬ অক্টোবর অমাবস্যা ও ৩১ অক্টোবর পূর্ণিমা হওয়ায় ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ নিধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ইলিশের আরও একটি প্রজনন মৌসুম লক্ষ্য করা গেছে বলে জানান ড. আনিছুর।
প্রতি লাখে ১০ হাজার ইলিশ
ড. আনিছুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিটি ইলিশ গড়ে ১০-১২ লাখ ডিম ছাড়ে। যে ইলিশ সবচেয়ে কম ডিম দেয়, তার পরিমাণও তিন লাখের নিচে হয় না। এ পর্যন্ত একটি ইলিশের সর্বোচ্চ ২১ লাখ ডিম ছাড়ার প্রমাণ রয়েছে গবেষণায়। তিনি জানান, যে পরিমাণ ডিম দেয় তার মধ্যে মাত্র ১০ ভাগ ইলিশ উৎপাদন হয়, অবশিষ্ট ডিম নষ্ট হয় নতুবা অন্য মাছে খেয়ে ফেলে। সে হিসাবে প্রতি লাখ ডিমে ১০ হাজার ইলিশ জন্মে। ড. আনিছুর রহমান জানান, গত বছর মোট সাত লাখ ৪০ হাজার কেজি ডিম ছেড়েছে। এদিয়ে ১০ ভাগ উৎপাদন হারে ৩৭ হাজার কোটি ইলিশ উৎপাদন হয়েছে আমাদের নদনদীতে।
মায়ের সঙ্গ তিন মাস
নদীতে ডিম ছাড়ার ৭০ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এক সেন্টিমিটার আকৃতিতে ইলিশ বাচ্চার জন্ম হয়। এক মাসে সেটি আড়াই সেন্টিমিটারে পরিণত হয়। মা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা না পড়লে প্রজনন করা বাচ্চা নিয়ে তিন মাস পর্যন্ত নদীতে ঘোরাঘুরি করে। এ সময়ের মধ্যে ইলিশের বাচ্চার আকৃতি হয় ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত। এগুলো বড় হওয়া নিশ্চিত করতে দেশের নদনদীর পাঁচটি অভয়াশ্রমে পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস করে ইলিশসহ সব মাছ নিধন নিষিদ্ধ থাকে। এর পরই মা ও বাচ্চা ইলিশ যে যার মতো স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি করে একপর্যায়ে গভীর সাগরে চলে যায়। সেখানেও তাদের জীবনায়ু বৃদ্ধিতে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত গভীর সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এক বছর পর ফের পেটে ডিম এলে মা ও আগের বছরের বাচ্চা ইলিশ প্রজননের জন্য আবারও আগের নদীতে চলে আসে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।
সর্বোচ্চ আয়ু সাত বছর
জেলেদের জালে ধরা না পড়লে একটি ইলিশ সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। রোগ-বালাই না থাকায় ইলিশের মড়ক হয় না বললেই চলে। ড. আনিছুর রহমান এ তথ্য জানিয়ে বলেন, এ পর্যন্ত আমাদের জলসীমায় সর্বোচ্চ তিন বছর বয়সী ইলিশ পাওয়া গেছে। জন্ম থেকে পরিণত ইলিশ হতে সময় লাগে এক বছর।
মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৪ সাল থেকে দেশে জাটকা (১০ ইঞ্চির কম সাইজের ইলিশ) রক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০০৮ সাল থেকে আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে ও পরে মিলিয়ে মোট ১১ দিন ইলিশ নিধনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে গবেষণায় দেখা যায়, অমাবস্যাতে প্রচুর মা ইলিশ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। পরে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার আগে-পরে মোট ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন শুরু হয়। এর সুফলও পেয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। ২০০৮-০৯ সালে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ৯৯ হাজার টন। ২০১৮-১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার টন। মূলত ২০১৪-১৫ সাল থেকে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে।