বিশেষ লেখা

শুধু কাগজ ঠিক রেখে সড়ক নিরাপদ হবে না

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. শামছুল হক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোরদের আন্দোলনে আইন প্রণয়নে মনে করেছিলাম, কর্তাদের চোখ খুলবে। সড়কে শৃঙ্খলা আসবে। সড়ক নিরাপদ হবে। কিন্তু এক বছরের মূল্যায়ন হলো, শৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। আইনও ভোঁতা হয়ে গেছে। আন্দোলনের পর জরিমানার ভয়ে লাখ লাখ চালক লাইসেন্স নিয়েছেন। মালিকরা গাড়ির ফিটনেস নিয়েছেন। কিন্তু গলদে ভরা প্রক্রিয়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস দিয়ে কাগজপত্র হালনাগাদ করে সড়ক নিরাপদ হবে না। পরিকল্পনা ঠিক
রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সৎ হতে হবে। বিজ্ঞান বলে, পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। সমাধান করতে হয় পরিকল্পনার মাধ্যমে।
নতুন আইনে জরিমানা বহু বেড়ে যাওয়ায় অনেক চালক লাইসেন্স নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ১০ গজ গাড়ি চালানোর পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স পাওয়া চালক আসলেই কি দক্ষ? লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গলদ রেখে দক্ষ চালক তৈরির আশা দুরাশা। পকেটে লাইসেন্স থাকা চালককে আইনে ধরার সুযোগ নেই। কিন্তু তার পেছনে যারা যাত্রী হচ্ছে, তারা কি নিরাপদ? চালকের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কত ভাষণ এ জীবনে শুনেছি! কিন্তু কাজের কাজ কি কিছু হয়েছে? নতুন আইন হওয়ার পর মামলা কমেছে। আজকাল নাকি প্রায় সব গাড়ির ফিটনেস সনদ আছে। কিন্তু গাড়ি কি আসলেই ফিট?
সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হওয়া উচিত ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু তারা হয়ে গেছে সেবাদাতা। যেখানে সরকার নিয়ন্ত্রক থেকে সেবাদাতা হয়, সেখানে ভালো কিছু হয় না। পৃথিবীর কোথাও হয়ওনি। বিআরটিএর মাত্র ১১৯ জন পরিদর্শক। তা দিয়ে ২৫/৩০ লাখ গাড়ির ফিটনেস দেওয়া কি সম্ভব? একটি গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় ৪২টি দিক যাচাই করতে হয়। এত কম জনবল দিয়ে কি তা সম্ভব? লাইসেন্স, ফিটনেস সব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।
যানজটের কারণে ঢাকা শহরে গাড়ির গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার। এত ধীরগতির একটি শহরে দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়। কিন্তু ঘটছে। কারণ, শৃঙ্খলা নেই। ঢাকার হাতিরঝিলে 'ঢাকা চাকা' নামে যে বাসগুলো চলে, তাতে গায়ে একটি আঁচড়ের দাগ নেই। কিন্তু অন্যান্য রুটের গাড়ি ভাঙাচোরা। এর কারণ হলো, অন্য রুটে যাত্রী পেতে বাসে বাসে প্রতিযোগিতা চলে। রেষারেষি চলে। সড়ক দখলের লড়াই হয়।
সেই ২০০৫ সাল থেকে বলে আসছি, ঢাকায় আর কিছুতেই বাস রুট বাড়ানো যাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা তার ফল ভোগ করছে। ২০১৫ সাল থেকে 'বাস রুট পুনর্বিন্যাস' করে রুটের সংখ্যা কমিয়ে ছয়টি কোম্পানির অধীনে বাস চালানোর কথা বলা হচ্ছে। পাঁচ বছরেও কাজটি হলো না কেন- এর জন্য অতীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি। জবাবদিহি না থাকলে কোনো প্রকল্পই সফল হবে না।
সড়কে বিশৃঙ্খলার সুফলভোগী যারা, তারা যদি শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্বে থাকেন, তাহলে কোনোদিনই সড়ক নিরাপদ হবে না। গবেষণা বলে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও ১৫ শতাংশ মানুষ সড়কে আইন ভাঙতে চায়। তাদের ঠেকাতে পুলিশ আছে। আর বাকিদের জন্য আছে একটি সুশৃঙ্খল 'সিস্টেম'। বাংলাদেশে শৃঙ্খলার পুরো বিষয়টি পুলিশের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়ে ভয় দেখিয়ে কাগজ ঠিক করা যাবে, কিন্তু সড়ক নিরাপদ হবে না। অভিযানে কাজ হলে দেশে মাদক থাকত না। সড়ক নিরাপদ করতে হলে সৎ পরিকল্পনা করতে হবে। চালককে দক্ষ করতে হবে। শুধু ফিটনেস সনদ নয়; গাড়ি ফিট করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনা আর নিজের স্বার্থ নয়; যাত্রীর লাভ বিবেচনায় প্রকল্প নিতে হবে। যারা দায়িত্বে আছেন তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে যারা পদে থেকে ভাষণ দিয়ে চলে গেছেন, তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে- কেন কাজ হয়নি?

বিষয় : বিশেষ লেখা