টানা তিন দিন ধরে চলা পণ্যবাহী নৌযান ধর্মঘট ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার প্রত্যাহার হওয়ার খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। বর্তমান বাংলাদেশে সড়কপথের তুলনায় যদিও নৌপথের ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম; যদিও সড়কের তুলনায় নদীতে ধর্মঘটের হার অনেকটাই কম; যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় এর প্রভাব কম নয়। বস্তুত নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযানের তুলনায় পণ্যবাহী নৌযান ধর্মঘটের তাৎপর্যও গভীর। সমকালে শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মাত্র তিন দিনের ধর্মঘটে আমদানিকারকদের ক্ষতি হয়েছে ৫০ কোটি টাকার বেশি। কারণ চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে অলস বসে থাকা জাহাজের প্রতিটির জন্য আমদানিকারকদের প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ টাকা মাশুল চুকাতে হয়। সোমবার মধ্যরাতে শুরু হওয়া এই ধর্মঘট যদিও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে কার্যত প্রত্যাহার হয়েছে; দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সঙ্গে সঙ্গে নৌপথে পণ্য পরিবহন সচল হতে পারেনি। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, বিভিন্ন ঘাটে আটকা থাকা পণ্যবাহী নৌযানগুলোর পূর্ণ কার্যক্রম শুরু হতে প্রয়োজন হবে আরও সময়। তাতে করে পণ্য খালাস ও পরিবহনে যে জট লেগে যাবে, তার প্রভাব বাজারেও পড়তে পারে। ধর্মঘট শুরুর আগেই শ্রমিক ও মালিক পক্ষকে নিয়ে সরকার যদি আলোচনায় বসতে পারত, তাহলে এই বিড়ম্বনা নিশ্চয়ই এড়ানো যেত।

মনে রাখতে হবে, দেশের যাত্রীদের ৩০ শতাংশ হলেও মালপত্রের সিংহভাগ পরিবহন হয় নৌপথে। সেখানে ধর্মঘট চললে গোটা পরিবহন ও উৎপাদন ব্যবস্থাই যে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়, তা বোঝার সক্ষমতা সংশ্নিষ্টদের নিশ্চয়ই রয়েছে। এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না, নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিমুখী বাণিজ্যের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। তার মানে, এর ফলে অনেক সময় বিদেশে বাংলাদেশের বাজার বিঘ্নিত হতে পারে। এমনকি অতীতে ধর্মঘটের কারণে কর্মাদেশ বাতিল হওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল। তার পরও পণ্যবাহী নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটের মতো বিষয়কে মালিকপক্ষ ও সরকারি কর্তৃপক্ষ কেন গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে না, এটা আমাদের না ভাবিয়ে পারে না। আমরা জানি, করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা একটি অস্বাভাবিক সময় পার করছে।

এই সময়ে এসে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার যে কোনো খাতে অদূরদর্শিতার ফল হতে পারে মারাত্মক। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ কিছু শিল্পের কাঁচামাল নৌপথে পরিবহন হয় বলে ধর্মঘটের জের ধরে অতীতে আমরা বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবরও পেয়েছিলাম। মন্দের ভালো যে, এবার তেমন পরিস্থিতি দৃশ্যত তৈরি হয়নি। কিন্তু আমরা মনে করি, এভাবে প্রায় প্রতিবছরই ধর্মঘটের পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। খাদ্য ভাতাসহ যে ১৫ দফা দাবিতে আটটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন এবং ছয়টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত নৌ-শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদ ধর্মঘট ডেকেছিল, সেগুলোর ন্যায্যতা অস্বীকারের অবকাশ নেই।

আমরা দেখেছি, খোদ নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন। আমাদের প্রশ্ন- তার পরও এ ব্যাপারে স্থায়ী নীতি গৃহীত হচ্ছে না কেন? আমরা মনে করি, সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা সদা সচল রাখার স্বার্থেই সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে নৌপথে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। সড়কপথে ধর্মঘটের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যতটা তৎপর হয়, নৌপথেও ততটাই হতে হবে। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, নৌযান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা এখনও অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের তুলনায় কম। যদিও গত কয়েক বছরে কয়েক দফা ধর্মঘটে এ ক্ষেত্রে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় এখনও যেতে হবে অনেকটা পথ। গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অব্যবস্থাপনা দূর করতেই হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও ভাবতে হবে ধর্মঘটের বিকল্প বিষয়ে। এভাবে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা জিম্মি করে দাবি আদায়ের পথ পরিহার করাই উত্তম। তবে সক্রিয় হতে হবে সরকারকেই; শ্রমিক ও মালিক দু'পক্ষের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর পথ বের করা কঠিন হতে পারে না।

বিষয় : পণ্যবাহী নৌযান ধর্মঘট

মন্তব্য করুন