পেশায় কৃষক না হলেও নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরবাটার বাসিন্দা গোলাম মাওলা বাড়ির পাশে আড়াই একর জমিতে আমন বুনেছিলেন। আধাপাকা সেই ধান তছনছ করে দিয়েছে টানা দুই দিনের ভারি বৃষ্টি। শুধু গোলাম মাওলা নন, সুবর্ণচরের সব ধানের জমি এখন পানির নিচে। আক্ষেপ করে গোলাম মাওলা বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে চলছে বৃষ্টি আর দমকা বাতাস। সব ধানগাছ মাটির সঙ্গে মিশে আছে, যা থেকে ধান তো দূরের কথা গবাদিপশুর জন্য খড়ও পাওয়া যাবে না।

গাইবান্ধার কৃষক নিজাম উদ্দিন গতকাল শনিবার মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, বেশিরভাগ ধানগাছ শুয়ে পড়েছে। ধানের মাথা ভার হওয়ায় ভারি বর্ষণে এ অবস্থা হয়েছে। সপ্তাহ দেড়েক পরই ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন নওগাঁর বাইপাস এলাকার কৃষক হামিদুল।

ভারি বৃষ্টিতে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধান কেটে ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে হঠাৎ এ দুর্যোগে মহাদুশ্চিন্তায় কৃষক। তারা বলছেন, কয়েক দফা বন্যার কারণে চড়া দামে বীজ কিনে রোপণ করা ধানের ফলন বিপর্যয়ে তারা চোখে অন্ধকার দেখছেন।

বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আমন ধানসহ শীতকালীন সবজিও। বরিশালে তিন দিনের ভারি বৃষ্টির ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে শীতকালীন আগাম সবজির বাগানে। গত বুধবার বিকেল ৩টা থেকে শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। বরিশাল কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবারের বৃষ্টিতে শীতকালীন আগাম সবজির সর্বনাশ হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত বেশিরভাগ সবজির ক্ষেত ছিল পানির নিচে। পানি পুরোপুরি অপসারণ হওয়ার পর তারা ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ করতে পারবেন। আগাম শীতকালীন সবজির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মুলা, পালংশাক, টমেটো, বেগুন, শিম, শসা ইত্যাদি। তিন দিনের ভারি বৃষ্টিতে বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচের চারাও নষ্ট হয়েছে।

বরিশাল কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাওফিকুল আলম বলেন, চাষিরা বেশি মূল্য পাওয়ার আশায় শীতকালীন সবজির আগাম চাষ করেন। এবার জেলার ১০ উপজেলায় ৫০০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি আবাদ করা হয়। এরমধ্যে ৩৭৫ হেক্টর জমি ভারি বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে বরিশাল সদর উপজেলা ও বাবুগঞ্জ উপজেলা। বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও একই চিত্র বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।

মুলাদী উপজেলা কৃষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, তার সংগঠনের ৮ জন লালশাক চাষ করেছিলেন। তা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। পালংশাক এবং টমেটোও শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমন ধান বের হওয়ার পর্যায়ে। বৃষ্টিতে নুয়ে পড়েছে।

মুলাদী উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কামরুজ্জামান জানান, উপজেলায় ৪০ হেক্টর জমিতে লালশাক, টমেটো, বেগুন ও ধনিয়া রোপণ করা হয়েছিল। এর পুরোটাই এখন পানিতে নিমজ্জিত। বাবুগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন জানান, এ উপজেলায় ৭০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির আগাম চাষ হয়েছিল। তার মধ্যে ৫২ হেক্টর জমি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় কৃষি খাত ব্যাপকভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ধানসহ ১২ ধরনের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠে বোনা আমন, আউশ ধান ও রোপা আমন ধান ছিল। কয়েক দফা বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর জমির আমন ডুবে যায়। একই সঙ্গে ডুবে যায় আমনের বীজতলাও। সরকারি প্রণোদনাসহ নিজেদের বিরামহীন প্রচেষ্টায় সেই ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষক। সেই বীজ থেকে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা আমনের আধাপাকা ধান ফের আক্রান্ত হলো দুই থেকে আড়াই মাসের ব্যবধানে। ফলে কৃষকের ঘরে এখন বিষাদের ছায়া।

চলতি মৌসুমে দেশের ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকার। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক কোটি ৫৪ লাখ টন। কিন্তু কয়েক দফা বন্যায় ৩৭ জেলার ৭০ হাজার ৮২০ হেক্টর জমির আমন ও সাত হাজার ৯১৮ হেক্টর বীজতলা নষ্ট হয়েছে। গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে গতকাল পর্যন্ত কৃষির সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব জানাতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমনের ব্যাপক ক্ষতির কারণে চলতি মৌসুমে উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আদনান বাবু বলেন, বৃষ্টি ও বাতাসে অনেক জমির আমন ধান মাটিতে নুয়ে গেছে। তার পরামর্শ, হেলে পড়া ধানগুলো প্রতি চারটি গোছা একসঙ্গে হালকা করে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে, যাতে ধানের গোছাগুলো পানি থেকে ওপরে থাকে। তাহলে ফলনের কোনো ক্ষতি হবে না। রোদ উঠলে ধানগাছ আবার উঠে দাঁড়াবে।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের (খানি) সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ সমকালকে বলেন, দুর্যোগ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না কৃষক। একের পর এক দুর্যোগ লেগেই আছে। আমনের ক্ষতি হওয়ায় করোনা ও বন্যা-পরবর্তী লোকসান পুষিয়ে নিতে পারছেন না কৃষক। এখনই তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিশেষ সুরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।