ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইরফান সেলিম অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। এ জন্য আলিশান 'চাঁন সরদার দাদা বাড়ী'তে খুলেছিলেন কন্ট্রোল রুম। 

ওই কন্ট্রোল রুম থেকে ৩৮টি ওয়াকিটকি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এসব ওয়াকিটকির মধ্যে ৩৭টি তার বিশ্বস্ত কর্মী আর ক্যাডারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে তিনি ওয়াকিটকির গোপন নেটওয়ার্কে যোগাযোগ রাখতেন। র‌্যাবের অভিযানে বাড়ির চারতলা ও পাঁচ তলার কন্ট্রোল রুম থেকে এসব ওয়াকিটকি জব্দ করা হয়। এ ছাড়া সেখান থেকে পাঁচটি ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার (ভিপিএস) জব্দ করা হয়। 

র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইরফান জানিয়েছেন, নিজের কর্মীদের সঙ্গে তিনি এসব ওয়াকিটকিতে কথা বলেন। তার বাসার আশপাশের পাঁচ থেকে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত এই ওয়াকিটকির নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। 

স্থানীয় লোকজন বলছেন, ইরফান সেলিম বাসায় ঢুকতে বা বের হওয়ার আগে তার অনুসারীরা ওয়াকিটকি হাতে পুরো রাস্তা বন্ধ করে দিতেন। সড়কে এক ধরনের 'ভিআইপি' প্রোটোকলেই চলতেন তিনি। তার সঙ্গীদের আচরণে বোঝার উপায় ছিল না- তারা সাধারণ মানুষ, নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ওয়াকিটকি হাতে এসব সদস্য পুরো এলাকা দাপিয়ে বেড়াতেন।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কথোপকথনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই হয়তো নিজস্ব নেটওয়ার্কে এসব ওয়াকিটকি ব্যবহার করতেন ইরফান সেলিম। ভিআইপি নিরাপত্তা যোগাযোগের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে থাকে। ব্যক্তিগত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসির অনুমোদন দরকার; যা ইরফান সেলিমের নেই। পুরো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

সোমবার দুপুর থেকে পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের দেবীদাস লেনে হাজী সেলিমের বাড়ি 'চান সরদার দাদা বাড়িতে' অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। অভিযানে ওই বাসা থেকে অস্ত্র, ৩৮টি ওয়াকিটকি, বিদেশি মদসহ অবৈধ জিনিসপত্র জব্দ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ইরফান ও তার দেহরক্ষীর বাসা থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হওয়ায় দুটি পৃথক মামলা করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় মোহাম্মদ ইরফান সেলিমকে দেড় বছর ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাদক সেবনের দায়ে এক বছর ও অবৈধ ওয়াকিটকি রাখার দায়ে ছয় মাসের দণ্ড দেওয়া হয় ইরফানকে। দেহরক্ষীকে অবৈধ ওয়াকিটকি রাখার দায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রোববার রাতে ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে ইরফান ও তার সহযোগীদের হাতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদ খান মারধরের শিকার হন। এ ঘটনায় হাজী সেলিমের ছেলেসহ চারজনের নাম উল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাত দু-তিনজনকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন নৌবাহিনীর ওই কর্মকর্তা। মামলা হওয়ার পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে সোমবার দুপুর থেকে হাজী সেলিমের বাড়ি ঘেরাও করে অভিযান চালায় র‌্যাব। 

বাবার বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন ইরফান। তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর। ইরফানের শ্বশুর নোয়াখালী-৪ আসনের এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। দিনভর ওই বাড়িতে অভিযানের সময়ে সাংসদ হাজী সেলিম বা তার স্ত্রীর দেখা মেলেনি সেখানে। র‌্যাবও তাকে বা তার স্ত্রীকে বাড়িতে পায়নি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, হাজী সেলিমের বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, গুলি, একটি এয়ারগান, ৩৭টি ওয়াকিটকি, ১০ ক্যান বিয়ার, একটি হাতকড়া, একটি ড্রোন, ৪০৬ পিস ইয়াবা ও বিদেশি মদ পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হবে। হাজী সেলিমের বাড়ির পাশে চকবাজারে তার ছেলের আরও একটি টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে।