জীবন জেগে থাকবে

সংকটেও অনন্য বাংলাদেশ

করোনাকালে হৃদয়ছোঁয়া সব মানবিক উদ্যোগ

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

'মানুষ মানুষের জন্য,/ জীবন জীবনের জন্য,/ একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?'- প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকার এই জিজ্ঞাসা আজও কড়া নেড়ে চলেছে মানুষের হৃদয়ের দরজায়। যুগে যুগে উদ্বেল মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। ভয়াবহ কভিড-১৯-জনিত মহামারির সময়েও মানুষ নানা বিপর্যয়ের মধ্যে থাকলেও প্রমাণ করেছে মানুষ সত্যিই মানুষের জন্য। শুরুর দিকে করোনাভাইরাসের ধাক্কায় মানবিক সম্পর্কের চিরায়ত সুতা একটু হলেও নড়ে উঠেছিল। অনেকের মনেই এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠছিল যে, করোনা আক্রান্ত হওয়া মানেই 'অচ্ছুৎ' হয়ে পড়া। করোনা আক্রান্ত কেউ মারা গেলে স্বজনরাও এগিয়ে আসেননি- এমন অনেক ঘটনাও ঘটেছে। মহামারির শুরুতে পরস্পর থেকে দূরত্ব আর বিচ্ছিন্নতা রচনা করাকেই যেন 'নিজেকে রক্ষার' একমাত্র ওষুধ মনে করা হয়েছিল।

কিন্তু করোনাকালের এমন বেদনাহত দুঃসহ স্মৃতির বাইরে রয়েছে অসংখ্য আশাজাগানিয়া গল্পও। সেসব গল্পের নায়ক-নায়িকারা মৃত্যুঝুঁকি থাকার পরও মানবিকতার অদম্য প্রেরণায় দৃষ্টান্তস্থানীয় সব ঘটনার জন্ম দিয়েছে। এমনকি এ-ও দেখা গেছে, যার ঘরে সামান্য এক বেলার খাবার নেই, সেই ভিক্ষুকই তার সারা জীবনের সব সঞ্চয় করোনা আক্রান্তদের সহযোগিতায় দান করে দিয়েছেন অবলীলায়।

এই মহামারিকালে চিকিৎসা দিতে, খাদ্য সংকট দূর করতে এবং সচেতনতা বাড়াতে অনেকে কাজ করেছেন ব্যক্তি উদ্যোগে, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছে এসব কাছে। যেখানে মৃতের পরিবারও সংশয়ে ছিলেন স্বজনের লাশ দাফন বা সৎকারের ব্যাপারে, সেখানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এসব মানুষ। সত্যিকার অর্থে তারাই মানবিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। করোনার নানামুখী সংকটেও তাদের হাত ধরেই রচিত হয়েছে অনন্য বাংলাদেশের গল্প।

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বহুবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। করোনাকালেও বিভিন্ন সংকটকে উপেক্ষা করে চিকিৎসক, বিদ্যুৎ-ওয়াসা-ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন জরুরি সেবাকর্মী, রাজনীতিক, ব্যাংকার, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সংবাদকর্মী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার নিজেদের প্রাত্যহিক দায়িত্ব পালনের পরও করোনাকালে দেশের নানা প্রান্তে দায়িত্ব পালন করে চলেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, পুলিশ ও মাঠ প্রশাসনের সদস্যরা। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি ত্রাণের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তা পৌঁঁছে দিচ্ছেন শহরে-গ্রামে। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষজনও নীরবে কোনো প্রচার ছাড়াই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশী, স্বজন, বন্ধু-সহকর্মীসহ পরিচিত-অপরিচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন খাবার, ওষুধ, সুরক্ষাসামগ্রী ও নগদ অর্থ নিয়ে।

করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এমন ছোট-বড় উদ্যোগ সত্যিই নজিরবিহীন। সমাজের নানা কদর্য ঘটনাকে ছাপিয়ে মানবতার এসব উদাহরণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত বাংলার আগামীর আশার আলো।

মানবিক নানা উদ্যোগে সম্পৃক্ত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন করোনাকালে তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে সবার সপ্রশংস দৃষ্টি অর্জন করেছে। 'এক টাকায় আহার' বিতরণসহ নানান মানবিক কাজে সম্পৃক্ত এ ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় নির্মাণ করে ১০০ শয্যার হাসপাতাল। এ ছাড়া করোনা সংক্রমণের শুরুতে পিপিই সরবরাহ, মসজিদ, হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনে অনেক জায়গায় জীবাণুনাশক ছিটিয়েছে তারা। সংগঠনটি সাধারণ ও পথচারী মানুষের জন্য হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী বেসিন বসায়। স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে বিতরণ করে ত্রাণ।

করোনাকালে পুলিশ নতুন এক আশাজাগানিয়া রূপে আবির্ভূত হয় মানুষের সামনে। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, লকডাউন নিশ্চিত, লাশ দাফন, করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজা, সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ, গান গেয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, কর্মহীন অসহায় মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী সরবরাহসহ নানা কাজে যুক্ত হয় পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে সব মিলিয়ে পুলিশের ১৭ হাজার ৮৫৪ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হন। সুস্থ হন ১৭ হাজার ২৭২ জন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭৯ জন পুলিশ সদস্য। এখন পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্সসহ আট হাজার ৮৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শতাধিক চিকিৎসক সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন থেকে ফর্মুলা সংগ্রহ করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে মানুষের বাড়ি বাড়ি বিতরণ করতে থাকেন নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। পরে তাকে অনুসরণ করে আরও অনেক কাউন্সিলর এবং বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ফর্মুলা নিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে বিতরণ করে। এ ছাড়া করোনাকালে খাবার বিতরণ থেকে শুরু করে টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়ার জন্য একটি ইউনিট গঠন করেন কাউন্সিলর খোরশেদ। এই কার্যক্রমে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করেন তার স্ত্রী আফরোজা খন্দকার ও তার টিমের সদস্যরা। এ ছাড়া করোনার হটস্পট হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে করোনায় আক্রান্ত বিভিন্ন মৃতদেহ দাফন করে দেশে-বিদেশে প্রশংসা অর্জন করেন কাউন্সিলর খোরশেদ।

সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ও তহবিল সংগ্রহ করে মানুষের পাশে দাঁড়ায় 'সমকাল', 'ঝযবনধ.ীুু' ও 'দ্য ডেইলি স্টার'। উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে 'মিশন সেভ বাংলাদেশ'। এ ছাড়া আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও সমকালের পাঠক সংগঠন সুহৃদ সমাবেশও যৌথভাবে নানা সহযোগিতা করছে।

করোনাকালে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গঠিত ইউএনওর ত্রাণ তহবিলে ১০ হাজার টাকা দান করেন ভিক্ষুক ৮০ বছরের নাজিম উদ্দিন। গত ২১ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবেল মাহামুদের হাতে এ টাকা তুলে দেন তিনি। ভিক্ষা করে তিনি তিল তিল করে ১০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন। করোনা মহামারিতে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিনের চোখে পড়ে। এ অবস্থায় অসহায় মানুষের জন্য তিনি তার জমানো টাকা ত্রাণ তহবিলে দেন। এই খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের পর তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে পড়ে। তিনি ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিনের জন্য নতুন ঘর ও তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।

খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম 'যেখানেই অনাহারি সেখানেই আমরা'র উদ্যোক্তারা ফোনে কিংবা ফেসবুক মেসেঞ্জারে খবর পেয়ে ছুটে গেছেন অসহায়ের পাশে। এটির অন্যতম উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর নাকির। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অনেকেই করোনার দুঃসময়ে কর্মহীন হয়ে খাদ্য সংকটে পড়েন। চক্ষু লজ্জায় তাদের অনেকে কারও কাছে হাত পাততেও পারতেন না। গোপনে এসব মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছে এই প্ল্যাটফর্মটি।

করোনা মোকাবিলায় দেশের ক্রিকেটাররাও এগিয়ে আসেন। বেতন-ভাতার একটি বড় অংশ দিয়ে তহবিল গঠন করেন তারা। এ উদ্যোগের কথা তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুলে ধরেন।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করেছে 'চেষ্টা ফাউন্ডেশন'। এই সংগঠনের মূলে রয়েছেন দু'জন উদ্যোক্তা- উম্মে তাবাসসুম ও জান্নাতুল ফেরদৌস। গত ১৬ মার্চ তারা একটি সামাজিক কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। কভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিককার এ কর্মসূচির নাম দিয়েছিলেন তারা, 'আসুন সচেতন হই-২০২০'। প্রতিদিন ফেসবুকে আপডেট দিয়ে, একের পর এক পোস্ট শেয়ার করে, মানুষকে সচেতন করার নানা কাজ করেছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রিকশাচালক, শ্রমিক, গরিব ও দুস্থ জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাবার বিতরণ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান আসাদ। করোনাকালে রাজধানীর ছিন্নমূল মানুষদের সেহেরি করাতে প্রথম রোজা থেকে প্রতিদিন দেড়শ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি প্ল্যাটফর্ম সহযোগী গ্রুপ।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য জমি দিয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তা। শুরুতে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের লাশ দাফনে বাধা দেওয়া হয় কোনো কোনো এলাকায়। এমনকি লাশ বহনের খাটিয়াও দেওয়া হতো না। এমন পরিস্থিতিতে করোনায় মৃতদের দাফনের জন্য জমি দিয়েছেন সিআইডির সিনিয়র এএসপি এনায়েত করিম রাসেল। নিজের এলাকা মানিকগঞ্জে পারিবারিক গোরস্তান হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য তিনি এ জমি কিনেছিলেন।

করোনাকালে অসহায় মানুষের পাশে থাকতে মার্চের মাঝামাঝি মাঠে নেমে পড়েন নাট্যকর্মী আসমা আক্তার লিজা। তিনি ও তার সঙ্গীরা মাস্ক-স্যানিটাইজারের পাশাপাশি শুকনো খাবারও বিতরণ করেন। ভাসমান অনেক মানুষের রান্নার সুযোগ নেই বলে একপর্যায়ে তিনি নিজেই রাঁধতে শুরু করেন। এদিকে করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে, বাড়তে থাকে খাবারপ্রত্যাশীর সংখ্যা। অন্যদিকে, অর্থকড়ি ফুরিয়ে আসতে থাকে লিজার। তবে অসহায় মানুষ প্রতিদিনই তার বাসার সামনে খাবারের জন্য ভিড় জমান। শেষ পর্যন্ত এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শ্বশুরের চিকিৎসার জন্য তারা পারিবারিকভাবে গ্রামের একটি জমি বিক্রি করেছিলেন। জমি বিক্রির সেই টাকা থেকেই খরচ শুরু করেন তিনি। স্বামী আহমেদ আকতার জ্যোতি তাকে এ কাজে সমর্থন জোগান।