ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের কথা

আমরা জেগে আছি জেগে থাকব

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মুস্তাফিজ শফি

'অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস' নিয়ে যাত্রা শুরু করা দৈনিক সমকাল পদার্পণ করেছে ১৬ বছরে। ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে যখন শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ববাসী লড়াই করছে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কোনো অনুষ্ঠানই করতে পারিনি আমরা। তবে ঘোষণা দিয়েছিলাম, পরিস্থিতি একটু থিতু হয়ে এলে প্রতিবারের মতোই পাঠকের সামনে হাজির হবো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ আয়োজন নিয়ে। করোনা সংক্রমণের প্রাথমিক ঝাপটা সামলে নিয়ে মানুষ ফিরতে শুরু করেছে নতুন স্বাভাবিকতায়। আর আশ্চর্য ষোলোকে উপলক্ষ করে আমরাও হাজির হয়েছি ধারাবাহিক আয়োজন নিয়ে।

গত দেড় দশকে আমরা কীভাবে সময় ও সমাজের সঙ্গে থেকেছি; দেশ ও দশের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এসেছি; মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তবুদ্ধির সপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি; সমকালের পাতায় পাতায় রয়েছে তার অগণিত স্বাক্ষর। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সমকাল সব সময় অতন্দ্রপ্রহরী। দেশের প্রগতিশীল শক্তি, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, সচেতন পাঠকই আমাদের শক্তি ও সাহসের অন্তর্নিহিত উৎস। ১৬তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে সমকালের পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ী, সাংবাদিক, সহকর্মী, বিতরণ ও বিপণনকর্মী- সবাইকে আমি অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে চাই। প্রতিদিন সমকাল প্রকাশ করতে গিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ও সদিচ্ছা অনুভব করি, উপলব্ধি করি।

সম্পাদক হিসেবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই- গত ১৫ বছরে সমকালের যা কিছু অর্জন, তার প্রশংসা আমার সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রাপ্য। যা কিছু সীমাবদ্ধতা, তার দায় সম্পাদক হিসেবে নিজের কাঁধে তুলে নিতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। একই সঙ্গে আমি আরেকবার সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই- সমকালের অর্জন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে, সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা এগিয়ে যাব। আমরা যেন ভুলে না যাই, সংবাদপত্র মানে 'প্রতিদিনের পরীক্ষা'। যেন মনে রাখি, সংবাদপত্র মানে সময়কে সঙ্গে নিয়ে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। এই পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতায় আমরা সবাইকে পাশে চাই।

বস্তুত দুই দশক আগেও প্রতিদিনের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতো পরদিন সকালে। এখন সারাদিন ধরেই প্রস্তুতি নিতে হয়, পরীক্ষা দিতে হয়। ক্ষণে ক্ষণে প্রকাশ হয় পরীক্ষার ফল। 'সংবাদপত্র' এখন ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সম্পূর্ণ 'সংবাদমাধ্যম' হয়ে উঠেছে। বিশ শতকে সংবাদপত্র, বেতার ও দূরদর্শনের মধ্যে যে ভেদরেখা- একুশ শতকে তা ক্রমান্বয়ে ঘুচে গেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার জন্য সৃষ্টি হয়েছে আগের চেয়েও বেশি এবং বড় চ্যালেঞ্জ। অক্ষর, আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র- তিন মাধ্যমের সমন্বয়ে কেবল সকালবেলার মুদ্রণ সংস্করণ নয়, অনলাইন সংস্করণেও আমাদের ২৪ ঘণ্টা জেগে থাকতে হয়।

আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত গোলাম সারওয়ারের নেতৃত্বে এবং আমাদের প্রকাশক এ. কে. আজাদের হাত ধরে ১৫ বছর আগে যখন সমকাল প্রকাশ হয়, তখন ছিল একটি সন্ধিক্ষণ। কেবল বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতেই সময়টা ছিল সংবাদমাধ্যমের জন্য বিশেষ সন্ধিক্ষণ। পুরোনো ধারার সংবাদমাধ্যম ক্রমে নিষ্প্রভ হয়ে, দিকে দিকে নতুনধারার সংবাদমাধ্যম নতুনতর আলো নিয়ে জ্বলে উঠছিল। সমকাল নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে সেই নতুনধারার অন্যতম প্রতিনিধি। গত দেড় দশকে নিজেদের প্রমাণ করেছি প্রগতির পরিব্রাজক হিসেবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার পথরেখা তৈরিতে নিবেদিত থেকেছি। গণতন্ত্র, গণমুখী রাজনীতি, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, কূটনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আমরা বাংলাদেশের জন্য নিরলস কাজ করে গেছি। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ন্যায্যতা, বিচারপ্রাপ্তি, নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আমরা থেকেছি আপসহীন। নদীবিধৌত এই মাটির সন্তান হিসেবে, হাজার বছর ধরে বাঙালি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুর একটি অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামাজিক দায়িত্ব ও সাংস্কৃতিক দীক্ষা প্রতিপালনেও আমরা কখনও পিছপা হইনি।

সমকালের দেড় দশকের এই পরিভ্রমণ সহজ ছিল না। যখন সমকাল প্রকাশ হচ্ছিল, তখন দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের বাড়বাড়ন্ত। তখন আমরা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর গাড়িতে রক্তেভেজা রাষ্ট্রীয় পতাকা উড়তে দেখেছি। তখন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় বারবার ছেদ ফেলছিল অনির্বাচিত শাসনব্যবস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছায়া। একে একে সামনে আসছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের ছদ্ম ও সমূহ প্রতিপক্ষ। এমন পরিস্থিতি যেমন দেশের, তেমনই সংবাদমাধ্যম হিসেবে সমকালের জন্যও ছিল চ্যালেঞ্জ। আজ পেছনে তাকিয়ে স্বস্তির সঙ্গে বলতে চাই- আমরা সব বিরূপ ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সাফল্য ও স্বকীয়তার সঙ্গে পাড়ি দিয়ে এসেছি। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ নিরন্তর। প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে নতুন নতুন দক্ষতা ও দূরদর্শিতায় এগিয়ে যাওয়ারই অপর নাম সংবাদমাধ্যম।

এই লেখা এমন সময় লিখছি, যখন দেশ ও জাতি পালন করছে 'মুজিববর্ষ'। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। সমকালের সম্পাদকীয় নীতির মূলে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, তেমনই রয়েছে বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নিজে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে ষাটের দশকে স্বাধিকার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন। আমি নিজেও ছাত্রজীবনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির ছাত্ররাজনীতি করেছি। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ গঠনে সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করেছি। সমকালের মনন, মেধা ও মিথস্ট্ক্রিয়ার মূলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু সব সময় 'দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা' প্রত্যাশা করতেন। সমকাল যে একটি দায়িত্বশীল দৈনিক, সেই কথা আমাদের প্রতিপক্ষও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে।

গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, যুদ্ধাপরাধের বিচার, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের শাস্তি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সমুন্নতি- এসব প্রশ্নে সমকাল যে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখে এসেছে, তা আমাদের দেড় দশকের পথরেখায় স্পষ্ট। মুজিববর্ষ উপলক্ষে গত ১০ মাস ধারাবাহিকভাবে আমরা যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, তা সুধীমহলে উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। আমরা আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন ৫২ পৃষ্ঠার যে বিশেষ আয়োজন প্রকাশ করছি, সেখানেও রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশেষ আলোকপাত। সমকালের ১৬ বছর পদার্পণ উপলক্ষে আমি আরেকবার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মহত্তর জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

আজকে সমকাল যখন ১৬ বছরে পদার্পণের বিশেষ আয়োজন প্রকাশ করছে, তখনকার পরিস্থিতিও নিশ্চয়ই সহৃদয় ও সচেতন পাঠক জানেন। করোনা পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্ব এখন পার করছে নাজুক সময়। এই মহামারিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল সংবাদমাধ্যম নিজে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও তার ব্যতিক্রম ছিল না। খোদ সমকালে আমরা এক কঠিন সময় পার করেছি। এই ঝড়ে অনেক সংবাদমাধ্যম সাময়িক ও স্থায়ীভাবে ঝরে গেলেও সমকাল কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে, এ বছর এপ্রিলের শেষ দিন প্রকাশিত 'আরেক নতুন যুদ্ধ' শিরোনামে এক লেখায় আমি তার খানিকটা আলোকপাত করেছিলাম। এর পুনরাবৃত্তি করে আজকের লেখাটি আমি ভারাক্রান্ত করতে চাই না। কিন্তু আমাকে অন্তত এটুকু বলতে হবে যে, সেই নতুনতর যুদ্ধ আমরা সাহসের সঙ্গে, সদিচ্ছার সঙ্গে, সক্রিয়তার সঙ্গে সামাল দিয়েছি। থেমে যাওয়া দূরে থাক, আমরা থমকেও যাইনি।

ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে এবং আরও কিছু নেতৃস্থানীয় সহকর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছি। আমাদের অনেক সহকর্মী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে 'হোম অফিস' করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমরা পাঠকের দুয়ারে হাজির হওয়া থেকে একদিনের জন্যও বিরত থাকিনি। মহামারি বা দুর্যোগের সময়ও নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সমুন্নত রাখতে পিছপা হইনি। এ সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রচলিত রাজস্ব খাতগুলো স্থবির ছিল; তা সত্ত্বেও আমরা প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছি। কঠিন সময়ে প্রিয় কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়- ''শুধু দু'টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ'' আমি ও আমার সহকর্মীরা হাসিমুখে মেনে নিয়েছি সৎ সাংবাদিকতার স্বার্থে। গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যমে চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেক তত্ত্ব ও বিশ্নেষণ তৈরি করেছেন গত দুই শতাব্দীতে। কিন্তু করোনা-চ্যালেঞ্জ ছিল অভূতপূর্ব। এর জন্য যেমন ছিল না পূর্বাভাস, তেমনই ছিল না প্রস্তুতি।

১৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে এ লেখায় আমি সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই- দুঃসময় কেটে যাচ্ছে। দুঃস্বপ্নের রাত পোহাবার আর বেশি দেরি নেই। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, যদি নিজ নিজ দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করে যাই, তাহলে আমাদের জন্য অনিবার্য অপেক্ষায় রয়েছে মায়াবী প্রদোষ, সোনালি সকাল।

কে না জানে, জীবন মানে ধারাবাহিকতা। জীবন মানে নিরন্তর সক্রিয়তা। দুঃখ, মৃত্যু, বিরহদহন সত্ত্বেও যে শান্তি, আনন্দ, অনন্ত জাগে- এই কথা বলে গেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমকালও তার সম্পাদকীয় নীতি ও সাংবাদিকতার নিষ্ঠায় শুরু থেকে জীবনের কথা, জেগে থাকার কথাই বলে এসেছে। ১৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে তাই আমাদের প্রতিপাদ্য- 'জীবন জেগে থাকবে'। জীবনের সঙ্গে জেগে থাকা সমকালের অঙ্গীকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমি সবাইকে আরও একবার শুভেচ্ছা জানাই। সবাই সমকালের সঙ্গে থাকুন, সমকালকে সঙ্গে রাখুন। টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র মেনে আমরা সবাই মিলে, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাব।