মাস্ক ব্যবহারের বালাই নেই, বাড়ছে করোনা

দেশে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ২২১২ মৃত্যু ৩৯

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবাংশী রায়

মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার থেকে রাজধানীতে শুরু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। মতিঝিলে অভিযানের সময় পথচারী ও শ্রমজীবীদের মধ্যে মাস্ক বিতরণ করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট  - সমকাল

মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার থেকে রাজধানীতে শুরু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। মতিঝিলে অভিযানের সময় পথচারী ও শ্রমজীবীদের মধ্যে মাস্ক বিতরণ করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট - সমকাল

দেশে হঠাৎ করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই ভাইরাসে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ৫৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক। একই সময়ে আরও দুই হাজার ২১২ জন শনাক্ত হয়েছে। গত ৭৬ দিনের মধ্যে এটিও সর্বোচ্চ সংক্রমণের ঘটনা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে করোনার সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করে, ২৫ থেকে ১০ শতাংশেও নেমেছিল। মৃত্যুও কমেছিল। তবে শীত মৌসুম সামনে রেখে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বা নতুন করে সংক্রমণ শুরুর আশঙ্কা করেছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অনেকের অভিমত, সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। কয়েকদিন ধরেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করাসহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত করোনা শনাক্তে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরুর তাগিদ দিয়েছেন অনেকে।
সরকারের পক্ষ থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। গত অক্টোবরে দু'দফা এবং চলতি মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সংক্রমণ ঠেকাতে জনসাধারণের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন। এরপরই 'নো মাস্ক নো সার্ভিস' এবং 'নো মাস্ক নো এন্ট্রি' কর্মসূচি নেয় সরকার। একই সঙ্গে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ঘোষণাও আসে। সীমিত পরিসরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাস্ক ব্যবহার না করায় বেশকিছু মানুষকে শাস্তিও দেওয়া হয়। এর পরও মাস্ক ব্যবহারের বালাই নেই।
সরকারি জরিপেও মাস্ক ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক যৌথ জরিপেও মাস্ক ব্যবহার না করার বিষয়টি উঠে এসেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে তারা জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। গত ২৭ আগস্ট ওই জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, দেশের ৪৮ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে না। মাস্ক ব্যবহার করলে করোনার ঝুঁকি কমে, এমন মত এসেছে ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশের কাছ থেকে। ব্র্যাকসহ তিনটি বেসরকারি সংস্থার গত ২৭ আগস্টে প্রকাশিত এক অনলাইন জরিপে বলা হয়, গরম ও অস্বস্তির কারণে ৬৭ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে না।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ সমকালকে বলেন, জনসাধারণের মধ্যে মাস্কের ব্যবহার নিয়ে চরম শৈথিল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুরুতে অধিকাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করলেও এখন তা করছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ধারণা করছি, ২০ শতাংশ মানুষও হয়তো মাস্ক ব্যবহার করছে না। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে মাস্ক ব্যবহার করতেই হবে। একই সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ রোধে সতর্ক হতেই হবে। এজন্য আরও জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
সরেজমিন ঘুরে একই চিত্র পাওয়া যায়। গতকাল কারওয়ান বাজার এলাকা ঘুরে সবজি, মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিক্রেতাদের দু-একজন ছাড়া অন্যদের মুখে মাস্ক পাওয়া যায়নি। একইভাবে ক্রেতার অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই।
কারওয়ান বাজার এলাকার মাছ বিক্রেতা রহিম মিয়া বলেন, করোনার শুরুর দিকে কয়েকদিন মাস্ক পরেছিলাম। মুদি দোকানি রমিজ আলী বলেন, মাস্ক ব্যবহার করে সব সময় বেচাকেনা করা সম্ভব নয়। শ্বাস নেওয়ায় সমস্যা হয়। রিকশাচালক বারেক মিয়া বলেন, মাস্ক পরে রিকশা চালানো কষ্টকর। দম বন্ধ হয়ে আসে। কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে মগবাজার মোড়, মৌচাক, শান্তিনগর, কাকরাইলসহ রাজধানীর কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়।
বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সমকালকে বলেন, বিআরটিএ, ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের সমন্বিত দল তদারকি করলে হয়তো সুফল মিলতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সমকালকে বলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহের একটি জরিপে দেখা যায়, আগে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করত। সেটি এখন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। ভ্যাকসিন আসার আগে করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ :করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে অ্যান্টিজেন অর্থাৎ র‌্যাপিড টেস্ট কিটের ব্যবহার শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, চলতি মাসের ১২ নভেম্বর সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা করা হয়। ওইদিন ১৭ হাজারের কিছু বেশি পরীক্ষা করা হয়। আর সর্বনিম্ন নমুনা পরীক্ষা করা হয় ৭ নভেম্বর। ওইদিন ১১ হাজারের কিছু বেশি পরীক্ষা করা হয়। চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ১৫ হাজারের আশপাশে থাকছে।
নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ সমকালকে বলেন, সংক্রমণের ব্যাপ্তি বন্ধ করতে হলে অ্যান্টিজেন ভিত্তিক র‌্যাপিড টেস্ট কিট ব্যবহার করে নমুনা পরীক্ষা শুরু করতে হবে। এতে শনাক্ত ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিক ফল পেয়ে দ্রুত আইসোলেশনে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। আর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সঙ্গে যথাযথভাবে কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণের অন্য একটি শর্ত বলে মনে করেন তিনি।
জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন, মত বিশেষজ্ঞদের :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্কের ব্যবহার, বাধ্যতামূলক নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোসহ দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশকিছু জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। করোনা রোগীদের শ্বাসকষ্ট হয়। এ ছাড়া শীত মৌসুমে রেসপাইরেটরির রোগ বেশি লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন হবে। অনেকের আইসিইউ লাগবে। হাসপাতালে এসব ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে থাকতে হবে।
করোনা প্রতিরোধ-সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটির চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা সমকালকে বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরুর চ্যালেঞ্জ অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে নমুনা পরীক্ষার পরিধি বৃদ্ধির পাশাপাশি হাসপাতালে সেবার মান বেড়েছে। এর পরও যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুত :করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি আরটিপিসিআর মেশিনের স্থানে এখন সারাদেশে ১১৭টি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। আরটিপিসিআর মেশিন আরও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে অ্যান্টিজেন টেস্টও দ্রুতই শুরু হবে। কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন করা হয়েছে। ভেন্টিলেটরের পাশাপাশি অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংখ্যা অনেক বাড়ানো হয়েছে। আইসিইউর শয্যা সংখ্যাও বেড়েছে। শুরুতে করোনার চিকিৎসা নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে যে ভীতি ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে। সুতরাং দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা কার্যকর করছে। এ কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সংক্রমণ ততটা তীব্র আকার ধারণ করতে পারেনি। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কম। অনেক দেশে করোনার দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ শুরু হয়েছে এবং সেটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে জোরালো প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ-সংক্রান্ত বেশকিছু নির্দেশনাও দিয়েছেন। এর বাইরে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি। সংক্রমণ ঠেকাতে এরই মধ্যে মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাস্কের ব্যবহার পুরোপুরি নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও কাজ শুরু করেছে। মাস্ক ব্যবহার করছেন না, এমন বেশকিছু ব্যক্তিকে দণ্ডও দেওয়া হয়েছে। অতএব সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক ব্যবহার করুন। একই সঙ্গে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। তাহলেই সংক্রমণ কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আমরা সফল হবো।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর এক দিন :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল জানানো হয়, করোনায় মোট মৃত্যু ছয় হাজার ২৫৪ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে মোট শনাক্ত চার লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৪ জনে পৌঁছেছে। এর বিপরীতে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক হাজার ৭৪৯ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর মধ্য দিয়ে করোনা সংক্রমিত তিন লাখ ৫২ হাজার ৮৯৫ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন।