আজ বিশ্ব টয়লেট দিবস

শৌচাগার ব্যবহারে অগ্রগতি, ঝুঁকি বাড়াচ্ছে পয়ঃবর্জ্য

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদুর রহমান

উপকূলীয় এলাকায় দরিদ্র মানুষ এখনও ব্যবহার করে অনুন্নত স্যানিটেশন। খুলনার দাকোপের ছবি 	- সমকাল

উপকূলীয় এলাকায় দরিদ্র মানুষ এখনও ব্যবহার করে অনুন্নত স্যানিটেশন। খুলনার দাকোপের ছবি - সমকাল

বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশনের আওতায় এসেছে। এখনও এর বাইরে রয়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ লোক। গত তিন দশকে এ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালেও দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ ভাগ খোলা জায়গায় মলত্যাগে অভ্যস্ত ছিল। বর্তমানে তা কমে ১ শতাংশেরও নিচে দাঁড়িয়েছে। তবে স্যানিটেশনে বাংলাদেশ সফল হলেও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে পয়ঃবর্জ্য।
পয়ঃবর্জ্য নিস্কাশনসহ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এ ছাড়া খোলা জায়গায় মলত্যাগের হার কমিয়ে আনা হলেও স্বাস্থ্যসম্মত উন্নত শৌচাগার ব্যবহারে সন্তোষজনক সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সচেতনতা তৈরি, প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিকল্পনার মাধ্যমে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার করা গেলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পর্যাপ্ত স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকাসহ সারাদেশের শহরগুলোর পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীর পানিতে মিশছে। এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ট্রেন ও লঞ্চের পয়ঃবর্জ্যও সরাসরি চলে যাচ্ছে পানি কিংবা খোলা জায়গায়। এ ছাড়া রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির ফলে ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে স্যুয়ারেজের বর্জ্য মিশে যাচ্ছে।
এ ধরনের সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব টয়লেট দিবস। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে ২০০১ সাল থেকে দিবসটি পালন শুরু হয়। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে এর স্বীকৃতি দেয়। দিনটির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য শৌচাগারের সুবিধা নিশ্চিত করা।
ঢাকা ওয়াসার সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের ১২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার পয়ঃবর্জ্য সমস্যার সমাধান হবে। তবে এটা বাস্তবায়ন করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বা তার চেয়ে কিছু বেশি সময় লাগবে। তাদের মতে, পয়ঃশোধনাগার নির্মাণসহ এ খাতের বরাদ্দ অব্যাহত রাখতে ২০৪১ সালের মধ্যে সম্প্রসারিত ঢাকাসহ রাজধানীর সব এলাকায় পয়ঃবর্জ্য সমস্যার সমাধান হবে।
পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং একটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন দেশ গড়তে সব ধরনের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনা হবে। পয়ঃবর্জ্য, কঠিন বর্জ্যসহ অন্য সব ধরনের বর্জ্য এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে পরিবেশ দূষিত না হয়। মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের ২০১৯ সালের গুচ্ছ জরিপ বা মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (মিকস) ফলাফলে বলা হয়েছে, দেশের ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ উন্নত শৌচাগার ব্যবহার করে। আর ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অনুন্নত শৌচাগার ব্যবহার করছে। শহরের বাসিন্দাদের ২২ শতাংশের বেশি ভাগাভাগি করে শৌচাগার ব্যবহার করছে। দেশে পয়ঃনিস্কাশন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও অনেক। ধনীদের তুলনায় দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের অনুন্নত স্যানিটেশন ব্যবহারের হার ৯ গুণ বেশি।
গতকাল বুধবার ওয়াটারএইডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে স্যানিটেশন। কিন্তু বিশ্বে চারজন মানুষের একজন টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। স্যানিটেশন ও ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স র?্যাঙ্কিংয়ে ১৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম।
ওয়াটারএইড জানায়, এ দেশের জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশের মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে। জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ সীমিত পরিসরে ও অনুন্নত স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, স্যানিটেশন খাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ দরকার। দরকার জলবায়ু অভিযোজন-সংক্রান্ত কার্যক্রম চালু করা।
বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাছের খান বলেন, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পয়ঃবর্জ্য শোধন করতে পারছে। বাকি পয়ঃবর্জ্য নদী, খাল, বিল, ডোবা, নালায় গিয়ে মিশছে। ঢাকা ওয়াসাকে এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। পয়ঃবর্জ্য দূষণের কারণে খাদ্যনালি এবং চর্মজাতীয় সব ধরনের রোগ হয়ে থাকে। আর এসব রোগ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্যান্সারে রূপ নেয়।
মিউনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ম্যাব) সভাপতি ও নীলফামারী পৌরসভার মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ বলেন, অনিয়মিত পয়ঃবর্জ্য নিস্কাশনের কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে। সে জন্য এসডিজির নির্দেশনা অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে পয়ঃবর্জ্য যথাযথ ও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপনার দিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরি।
ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু বলেন, শহরের সাধারণ মানুষ খুব ভালোভাবে আইন মানেন। কিন্তু বড়লোক ও রাজনৈতিক নেতারা আইন মানেন না। তারা এখনও টয়লেটের লাইন সরাসরি ড্রেনে দিয়ে দেন। এতে বর্জ্য সরাসরি নদীতে চলে যায়।
পয়ঃবর্জ্য নিয়ে সরকারের নগর প্রকল্পের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুল হাসান বলেন, ১১৭টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও পয়ঃবর্জ্য প্রকল্প চালু রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় সমস্যা জমির অভাব। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় জমি কমিয়ে প্লান্ট করার চিন্তা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিডব্লিউআইএস-এফএসএম সাপোর্ট সেলের সিইও ড. আবদুল্লাহ আল মুয়ীদ বলেন, নিরাপদ স্যানিটেশনের শুরু হয় টয়লেট থেকে। টয়লেটের বর্জ্য ট্রিটমেন্ট না হলে তাকে নিরাপদ স্যানিটেশন বলা যায় না।