স্থবিরতার শঙ্কা মাদক মামলার বিচারে

বাদ পড়ছে প্রতি জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবু সালেহ রনি

২০০২ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর গুলশানের নিকেতনের এ ব্লকের ১২৯ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মাদক ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম ওরফে জুয়েলকে। তার কাছ থেকে ডব্লিউ-ওয়াই লেখা ১২০টি ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। যেগুলো পরে তদন্তে শনাক্ত হয় ইয়াবা হিসেবে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুলশান থানার মামলাটিই এ দেশের প্রথম ইয়াবা-সংক্রান্ত মামলা।
এ মামলায় জুয়েলসহ আরও ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল আদালতে। কিন্তু ১৮ বছরে আলোচিত এই মামলায় বিচারিক আদালতে ১৫ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দু'জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অন্য সাক্ষীদের বারবার সমন দিলেও তাদের খোঁজ আর মিলছে না।
শুধু গুলশান থানায় করা এ মামলাই নয়, দেশের সব আদালতে বর্তমানে দুই লাখেরও বেশি মাদক-সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন। অথচ গত ৮ নভেম্বর সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) ২০২০ বিল- যেটিতে বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে মাদক মামলার বিচারে প্রতি জেলায় পৃথক মাদকদ্রব্য অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধানই বাদ দেওয়া হয়। অবশ্য সংসদ থেকে সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বিলটিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যমান মাদকদ্রব্য আইনের ৪৪ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করতে পারবে। তা ছাড়া ট্রাইব্যুনাল স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে সংশ্নিষ্ট জেলার যে কোনো অতিরিক্ত জেলা জজ বা দায়রা জজকে তার দায়িত্বের অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বও দিতে পারবে। কিন্ত এবার আইন সংশোধন করে ওই পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান বাদ দিয়ে কর্মরত অতিরিক্ত জেলা জজদেরই অন্যান্য মামলার পাশাপাশি মাদক মামলার বিচারের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্নিষ্ট বিচারকরা বলছেন, মাদকের বিস্তার যে কোনো দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। মাদক মামলার বিচারের ভারও যদি স্থায়ীভাবে অতিরিক্ত জেলা জজদের দেওয়া হয়, তাহলে বিচারে ধীরগতি আসবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বরং মাদক মামলার বিচারে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন। এদিকে গত বছরের ৮ জুলাই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চও মাদক মামলার বিচারে আইন অনুযায়ী পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যা বাস্তবায়ন না হওয়ায় দফায় দফায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা গেছে। কিন্তু এবার ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধানই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
আইন সংশোধনের বিষয়ে প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে, এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতকে মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। কেউ আপিল করতে চাইলে রায় দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা করতে হবে।
খসড়া আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, প্রস্তাবিত আইনের অধীনে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধগুলো অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী 'এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত' কর্তৃক বিচার্য হবে। সংশ্নিষ্ট দায়রা জজ, মহানগর দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তার এখতিয়ারাধীন এলাকার জন্য কেবল মাদকদ্রব্য অপরাধের বিচারে প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত নির্দিষ্ট করবেন। ফলে মাদক অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।
তবে মাদক মামলার বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক সমকালকে বলেন, 'দেশে যখন লাখ লাখ মামলার জট তখন ভিন্ন ভিন্ন অপরাধের বিচার করার জন্য বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের প্রয়োজন অনেক বেশি। এ প্রেক্ষাপটে মাদক মামলার বিচারের জন্য প্রতি জেলায় মাদকদ্রব্য অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিবর্তে এই আদালতের বিধান বাতিলের জন্য বিদ্যমান আইনের সংশোধন আনা প্রধানমন্ত্রীর মাদক নিয়ন্ত্রণে 'জিরো টলারেন্স' নীতির পরিপন্থি। আইনে এ ধরনের সংশোধনী না এনে প্রতি জেলায় বরং বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করাই এখন কাম্য।'
তার মতে, 'মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনে দেরি হলে আপাতত অতিরিক্ত জেলা জজ বা এমন কাউকে বিচারিক এখতিয়ার দিয়ে গেজেট প্রকাশ করলেই হয়। এটি তো সময়সাপেক্ষ নয়। তা না করে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান বাদ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।'
সদ্য প্রকাশিত সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের নিম্ন আদালতে বর্তমানে এক লাখ ৭৭ হাজার ৮৯টি মাদক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ২৬ হাজার ১২৪টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকা মামলার সংখ্যা হচ্ছে ৩০টি। চলতি বছরে গত ১০ মাসে সারাদেশে মাদক মামলার সংখ্যা বেড়ে এখন দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আইনের মারপ্যাঁচে আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ আসামি ছাড়া পেয়ে আবারও মাদক ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ সামান্য পরিমাণ মাদক বহনের কারণেও বছরের পর বছর কারাগারে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি এবং আদালতের কাঠামোও অনেকাংশে দায়ী। সময়মতো মামলার বিচার না হওয়ায় মাদকের ভয়াবহতা যেমন কমছে না, তেমনি পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে।
নিষ্পত্তি ও দায়ের :সমকালের কাছে থাকা তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ২৩ হাজার ৭৬৪টি মাদক মামলা বিচারাধীন। আদালতের সর্বশেষ তথ্যসূত্র অনুযায়ী, গত বছর ঢাকায় মাত্র ৬৫৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ঢাকার পরে সবচেয়ে বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে চট্টগ্রামে। এই জেলায় বর্তমানে ২০ হাজার ৯৬টি মামলা বিচারাধীন; নিষ্পত্তি ৭১৯টি। এরপর যথাক্রমে কুমিল্লায় ৯ হাজার ৯৬২, রাজশাহীতে আট হাজার ১১৮, নারায়ণগঞ্জে সাত হাজার ৯৮৭, ময়মনসিংহে সাত হাজার ২৮০, কক্সবাজারে ছয় হাজার ৮৭৯, যশোরে ছয় হাজার ৭৮, গাজীপুরে পাঁচ হাজার ৭০, নওগাঁয় চার হাজার ৩০০টি মামলা বিচারাধীন। গত বছর ৬৪ জেলায় নিষ্পত্তি হয়েছে আট হাজার ৬৭৬টি মামলা। এর মধ্যে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে মাদক-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে যথাক্রমে দুটি ও ছয়টি। দুটি জেলায় বর্তমানে দুই হাজার ২৫৫টি মামলা বিচারাধীন।
মাদক মামলার দ্রুত বিচারের বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, নিম্ন আদালতে এখনই প্রায় দুই লাখ মাদক মামলা রয়েছে। সেখানে প্রতি জেলায় পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান বাদ দেওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। এ বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা উচিত।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান বলেন, 'সরকার ইচ্ছে করলেই মাদক মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে একটি গেজেট প্রকাশ করে মাদক-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে হবে। এটি করা হলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী ১৩৫ দিনের মধ্যে মাদক মামলা নিষ্পত্তি হবে।'