ইলিশ প্রজনন

উৎপাদনে এবার হতে পারে রেকর্ড

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদুর রহমান

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, এবার যে ২২ দিন ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল, সে সময় ৫১ দশমিক ২ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে। যা গত বছরের তুলনায় দেড় থেকে দুই শতাংশ বেশি। ফলে নতুন ইলিশ যুক্ত হতে পারে ৩৭ হাজার ৮শ কোটি। মোট উৎপাদন হতে পারে ৬ লাখ টনের বেশি ইলিশ। এর বাজারমূল্য হতে পারে ২৫ হাজার কোটি টাকা। ইলিশ উৎপাদনে এবার অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে গবেষণায়।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আনিছুর রহমানের নেতৃত্বে ৫টি গবেষক দল ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন নদনদী ও ইলিশের অভয়াশ্রমে গবেষণা চালায়। নিষিদ্ধ সময়ের আগের ১০ দিন, নিষিদ্ধ সময়ের ২২ দিন এবং পরবর্তী ১০ দিন নমুনা ও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ মৌসুমে দেড় থেকে দুই শতাংশ বেশি মা ইলিশ প্রজনন কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছে। এবার ৫১ দশমিক ২ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৪৮ দশমিক ৯২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৪৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৪৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ২০১৫ সালে প্রায় ৩৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৩৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এ বছর ৩৭ হাজার ৮শ কোটি নতুন ইলিশ যুক্ত হতে পারে। এই জাটকা ইলিশ পাঁচ থেকে সাত মাস নদনদীতে বড় হয়ে সাগরে চলে যাবে। সেখানে বড় হয়ে ডিম ছাড়ার জন্য আবার নদনদীতে অবস্থিত অভয়াশ্রমে চলে আসবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, ইলিশ মাছ সারাবছরই ডিম ছাড়ে। তবে ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে অক্টোবর-নভেম্বর মাস। এটি মূলত আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাভিত্তিক। এ জন্য ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময় বছর বছর পরিবর্তিত হয়। চলতি বছর ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর ২২ দিন দেশব্যাপী ইলিশ মাছ ধরা, মজুদ, বেচাকেনা ও পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ এ সময় নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদী কেন্দ্র চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষণা দলের প্রধান ডা. আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, আমাদের এবারের গবেষণা শেষ। খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয় এটি প্রকাশ করবে। অভয়াশ্রমে তদারকি বৃদ্ধির কারণে সাগর থেকে বেশি মা ইলিশ নদীতে এসে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। এবার ডিম ছাড়ার হার বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অক্টোবরের শেষদিকে যদি পূর্ণিমা হয় এবং পূর্ণিমা যদি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলে তাহলে ইলিশ প্রজননে ভালো ফল পাওয়া যায়। এবার অমাবস্যা ছিল ১৬ অক্টোবর। অক্টোবরের শেষদিকের পূর্ণিমা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ছিল। এ ছাড়া এবার নিষিদ্ধ সময়ে একটি নিম্নচাপ ছিল। এটিও ভালো ফল দিয়েছে। কারণ ওই সময়ে নদীতে জেলেরা ছিলেন না। তিনি বলেন, এখন যে ৩৭ হাজার ৮শ কোটি জাটকা আসবে, তা সুরক্ষিত রাখতে হবে। ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা ধরা নিষেধ। ২৫ সেন্টিমিটারের নিচে ইলিশ ধরা যাবে না। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের চলতি বছরের হিসাবে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতি বছর উৎপাদন ১০-১২ হাজার টন বাড়ছে। বাড়ছে স্বাদ, ওজন এবং আকৃতিও। অথচ চার বছর আগেও বিশ্বের মোট ইলিশের উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ হতো বাংলাদেশে। এই সময়ের মধ্যে এখানে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ইলিশের উৎপাদন। সে তুলনায় প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। সাগরে অনুকূল পরিবেশ, অভয়াশ্রম তৈরি, নতুন নতুন গবেষণা ও প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ সময়ে কড়াকড়ির কারণে এর সুফল মিলছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ সমকালকে বলেন, চলতি বছর মা ইলিশ বেশি সুরক্ষিত হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এ বছর ইলিশ উৎপাদন বাড়বে। এ উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য আমরা নানা রকম পরিকল্পনা নিয়েছি। ছোটখাটো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা মা ইলিশ রক্ষায় ইলিশ শিকার, আহরণ, বাজারজাতকরণ, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ করার কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। ফলে এই মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন অনেক বাড়বে।