শিক্ষা অফিসার নেই ২৪ জেলায়

পরিদর্শন ও মনিটরিং ছাড়াই চলছে কার্যক্রম

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বির নেওয়াজ

জেলা পর্যায়ে সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পরিদর্শন, সুপারভিশন ও মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল কর্মকর্তা 'জেলা শিক্ষা অফিসার' (ডিস্ট্রিক্ট এডুকেশন অফিসার বা ডিইও)। অথচ দেশের ৬৪ জেলার ২৪টিতেই শিক্ষা কার্যক্রম চলছে কোনো ডিইও ছাড়াই। এমনকি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জেলা কিশোরগঞ্জ ও গোপালগঞ্জেও নেই ডিইও। নেই চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহর ছাড়াও পুরোনো ও বড় বেশ কিছু জেলায়।
মূল কর্মকর্তা না থাকায় নিচের পদের কর্মকর্তাকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে এসব জেলায় কোনোরকমে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে জেলা শিক্ষা অফিসগুলোর কাজ। কোথাও আবার নিচের কর্মকর্তা পদটিও শূন্য থাকায় এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা সদরের সরকারি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। বছরের পর বছর ধরে চলছে এমন অবস্থা।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী সমকালকে বলেন, শিক্ষা নিয়ে প্রতিশ্রুতিশীল সরকারের সময়ে দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় শিক্ষা কর্মকর্তা না থাকার বিষয়টি দুঃখজনক। কারণ, শিক্ষা খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হলো মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং ও সুপারভিশন। এ কাজ করা না গেলে কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি জেলায় বর্তমানে জেলা শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য। যেসব জেলায় ডিইও নেই, সেগুলো হলো- গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম, ভোলা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও বান্দরবান। ডিইও নিয়োগ ও পদায়নকারী কর্তৃপক্ষ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এতগুলো জেলায় ডিইও পদ শূন্য থাকার কারণ জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক বেলাল হোসেন সমকালকে বলেন, এ মুহূর্তে ডিইও পদে পদোন্নতিযোগ্য কোনো কর্মকর্তা নেই। তাই কাউকে পদোন্নতি দিয়ে এ পদে পদায়ন করা যাচ্ছে না।
নিয়োগবিধি অনুসারে দু'ভাবে ডিইও পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি ২০ শতাংশ এবং সহকারী শিক্ষা অফিসারদের (এডিইও) মধ্য থেকে ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এ পদ পূরণ করা হয়। পিএসসির মাধ্যমে ২০ শতাংশ পদ বর্তমানে পূরণ করা আছে। তবে ফিডার সার্ভিস পূরণ না হওয়ায় পদোন্নতির মাধ্যমে বাকি ৮০ শতাংশ পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে যারা এডিইও পদে কর্মরত আছেন, তারা এ পদে ২০১৮ সালে পদোন্নতি পেয়েছেন। ডিইও হওয়ার জন্য তাদের চার বছরের ফিডার সার্ভিস পূর্ণ হবে ২০২১ সালে।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাউশি চাইলে সহজেই জেলা শিক্ষা অফিসারের শূন্য পদ পূরণ করতে পারে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব পদ শূন্য রেখেছে। এই নেতা বলেন, নিয়োগবিধি অনুসারে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদ ও জেলা শিক্ষা অফিসার পদ সমান গ্রেডের। জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডে তারা বেতন পান। প্রধান শিক্ষকদের জেলা শিক্ষা অফিসার পদে সহজেই পদায়ন করে এসব পদ মাউশি পূরণ করতে পারে। অতীতেও এমন নজির আছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শরীয়তপুরে জেলা শিক্ষা অফিসার নেই দীর্ঘদিন ধরে। সেখানে সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারও নেই। দুটি পদই শূন্য থাকায় পাশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত ডিইওর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসের এক কর্মচারী জানান, মূল কর্মকর্তা না থাকায় নানা সমস্যা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা থেকে ২০২১ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপা হয়ে আসছে। সেগুলো রাখার ব্যবস্থা করা, সমন্বয় ও বণ্টনের মূল দায়িত্বও ডিইওর।
অনেক জেলায় আবার মূল দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে ডিইওদের। বহু স্থানে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের (ইউসিইও) পদ শূন্য থাকায় ডিইওরা এসব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
কেবল ডিইও নয়, মাউশির ৯টি অঞ্চলের আঞ্চলিক উপপরিচালকের মধ্যে তিনটি পদই বর্তমানে শূন্য। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উপপরিচালক ও জেলা শিক্ষা অফিসারের দুটি পদই শূন্য থাকায় এ দুটি পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত দাস। সব মিলিয়ে এখন তাকে তিনটি পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বরিশালের জেলা শিক্ষা অফিসার আনোয়ার হোসেন অতিরিক্ত হিসেবে মাউশির বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক উপপরিচালকের দায়িত্বেও রয়েছেন। কুমিল্লায় আঞ্চলিক উপপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন কুমিল্লা সরকারি নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রোকসানা ফেরদৌস।
আঞ্চলিক উপপরিচালকের অধীনে সে অঞ্চলের বেসরকারি স্কুল শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কাজ করা হয়। এমপিওভুক্তির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সেগুলো আঞ্চলিক অফিসে পাঠান ডিইও। এসব পদে দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত কেউ না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় শিক্ষার মান ও অফিস ব্যবস্থাপনায়ও ধস নেমেছে। যার প্রমাণ মিলেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে এমএমসি ড্যাশবোর্ডের সাম্প্রতিক মনিটরিং রিপোর্টে। জেলা শিক্ষা অফিসগুলোর মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম মনিটরিং ও ই-নথি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই ক্যাটাগরিতে এ মূল্যায়ন করা হয়। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৮ মার্চ পর্যন্ত সময়কালের তথ্য নিয়ে এ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় এবং তা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম মনিটরিং সিস্টেমের ওয়েবসাইটেও আপলোড করা হয়।
এ মূল্যায়ন অনুসারে, ই-নথি ব্যবস্থাপনায় গোপালগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিস ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩তম হয়েছে। ৬৪তম হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিস। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনায় (এমএমসি) এ জেলার অবস্থান ৪৮তম। এভাবে ই-নথি ব্যবস্থাপনায় মাদারীপুর ৫৬তম, শরীয়তপুর ৫৩তম, রাজবাড়ী ৪৮তম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৪১তম এবং লক্ষ্মীপুর, সিলেট জেলা শিক্ষা অফিস ২৫তম হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের ক্ষেত্রে হবিগঞ্জ ৫৬তম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৯তম, বগুড়া ৬১তম, ঝালকাঠি ২৪তম, পিরোজপুর ১৮তম অবস্থানে রয়েছে। এভাবে চট্টগ্রাম, ভোলা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও বান্দরবান জেলা শিক্ষা অফিসও এ মনিটরিং রিপোর্টে র‌্যাঙ্কিংয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।