প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

কোনোভাবেই পার পাবে না দুর্নীতিবাজরা

সমকালকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হকিকত জাহান হকি

ইকবাল মাহমুদ

ইকবাল মাহমুদ

'এই করোনা মহামারির মধ্যেও যারা দুর্নীতি করবে তাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবস্থান অত্যন্ত শক্ত। কোনো পরিস্থিতিতেই দুর্নীতিবাজরা পার পাবে না। কোনো দুর্নীতিই কখনও তামাদি হয় না। যে অপরাধ করবে, তাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।'
আজ শনিবার দুদকের ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।
দুদকের এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। কারণ করোনাজনিত পরিস্থিতির কারণে জেলা, বিভাগ, কেন্দ্রে কোনো ধরনের র‌্যালি, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কোনোটিই হবে না। দিবসটি পালন করা হবে সীমিত পরিসরে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল সভায় আলোচনা করা হবে।
সাক্ষাৎকারে দুদক চেয়ারম্যান করোনা মহামারির এই প্রেক্ষাপটে দুর্নীতিবাজদের মনমানসিকতার দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, করোনা মানুষকে একই সমতলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি দুর্নীতিবাজদের আত্মশুদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই মহামারির করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিলে দুর্নীতিবাজদের সামনে আরও নিঃসঙ্গ, ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করবে। করোনাকালেও যারা দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছে, তারা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, যারা দুর্নীতিবাজ, দুর্নীতি করছে- এই মহামারিতে তাদের মধ্যে এক ধরনের উপলব্ধি আসতে পারে বলে আমরা মনে করছি। এই মহামারি শিখিয়েছে, দুর্নীতি করে টাকাপয়সা, সম্পদ, বিত্ত-বৈভব করে কোনো লাভ হয় না। মহামারিতে মানুষের অসহায়ত্ব তাই শিখিয়েছে।
মহামারি শিক্ষা দিয়েছে- যারা দুর্নীতি করছে তাদের উচিত এখনই তা বন্ধ করা।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, 'আসুন আমরা দুর্নীতিকে না বলি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি, একই সঙ্গে যারা দুর্নীতি করে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করি।'
সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমরা প্রতি বছরই ঘটা করে দুদকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে থাকি। ঘটা করে পালনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দুটি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশ ও জাতির আকাঙ্ক্ষাগুলো পর্যালোচনা করা ও বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা তৈরি করা। দেশের দুর্নীতির মাত্রা যেন কমে, আমরা যেন কাউকে হয়রানি না করি, সময়মতো যেন অনুসন্ধান, তদন্তের সব রিপোর্ট জমা দেই, একই সঙ্গে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু ন্যায়বিচার করা দরকার, সেটুকু যেন নিশ্চিত হয়- এটা একটি উদ্দেশ্য। আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করা। সবাইকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। দুর্নীতি সমাজ, দেশ এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি করছে। যে দুর্নীতি করছে, তারও ক্ষতি হচ্ছে। এই বোধ যাতে মানুষের মধ্যে আসে, আমরা মানুষকে এটাই বোঝাতে চাই। এই জন্যই প্রতি বছর ঘটা করে দুদকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে থাকি।
তিনি বলেন, এবার করোনার কারণে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘটা করে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও এবার দিবসটি পালন করা হবে। আমরা নিজেদের শুদ্ধ করতে পারি কিনা, আমাদের মধ্যে যেসব ঘাটতি আছে সেগুলো পূরণ করতে পারি কিনা, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই গণ্ডি থেকে বের হওয়ার অঙ্গীকার করা হবে। এ লক্ষ্যে সারাদেশে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা), বিভাগীয় কার্যালয়, প্রধান কার্যালয় থেকে দিবসটি পালন করা হবে। কাজের ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য কী করা উচিত, সৃজনশীল কী কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার, কী কাজ করলে মানুষের আস্থা অর্জন করা যায়, কী করলে দুর্নীতির মাত্রা কমবে- সেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, এবার দেখলাম দুর্নীতির আন্তর্জাতিক সূচকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবু দুর্নীতির সূচক যাই হোক না কেন, আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, দুর্নীতি দমনে কাজ করছি এবং মানুষ জানতে পারছে যে, দুর্নীতি করলে শাস্তি হয়। দলমত নির্বিশেষে আমরা সেই কাজটা করছি। গত এক বছর যেভাবে কাজগুলো শুরু করেছিলাম, সেভাবে করতে পারিনি। এখন ইচ্ছা করলেই কাজগুলো সেভাবে করা যাবে না। কারণ এখন করোনা মহামারির কারণে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখন মানুষ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এই মহামারির নানা বিষয় বিবেচনা করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। তবে এই সংকটকালীন সময়েও দুর্নীতিকে একটি সীমাবদ্ধ অবস্থায় রাখার চেষ্টা করেছি।
দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমরা চেয়েছিলাম গত এক বছরে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করব। করোনার কারণে এই কাজটি করতে পারিনি। বর্তমান কমিশনেরও এটি শেষ বছর। এই বছরটায় আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম।
ইকবাল মাহমুদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হচ্ছে না। এটা অনেক বড় ক্ষতি। ব্যবসার ক্ষতি, সাধারণ মানুষের আয়-উন্নতির ক্ষতি, চাকরি-বাকরিতে সমস্যা হচ্ছে। এটাও মানতে হবে, সেবা যা দেওয়ার কথা, সেটা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, করোনার ভয়াবহ প্রকোপের সময় দুদকের কর্মকর্তারা হতদরিদ্রের জন্য বরাদ্দ দেওয়া চাল, গম আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে কাজ করেছে। করোনাকালীন সময়ে এর বাইরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কাজ করার ছিল। কিন্তু সেগুলো করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, যাদের আল্লাহ-খোদার ভয় নেই, মানুষকে ঠকায়, তারা মানুষরূপী অমানুষ। সরকারের খাদ্য নিরাপত্তার সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের বড় কাজ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মাস্ক, পিপিইর মতো খুব জরুরি ও অনুভূতিপ্রবণ পণ্য নিয়েও দুর্নীতি হয়েছে। আমরা তাদের ছাড়িনি। ধরেছি। আরও ধরা হবে।