বিক্রয়কর্মী থেকে ‘গোল্ডেন মনির’

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

নিজের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মনির হোসেনকে, ছবি: ফোকাস বাংলা

নিজের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মনির হোসেনকে, ছবি: ফোকাস বাংলা

একসময় গাউছিয়ায় একটি কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী ছিলেন মনির হোসেন। সেই মনির রাতারাতি হয়ে গেলেন কোটিপতি! একপর্যায়ে বনে যান ‘গোল্ডেন মনির’। আজ টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, সোনা-দানা, ঢাকায় অসংখ্য প্লট, কী নেই তার! কিন্তু কীভাবে সম্ভব? শনিবার র‌্যাবের অভিযানে ধরা পড়ার পর বেরিয়ে এসেছে তার এই বিশাল সম্পদের পেছনে নানা অপকর্মের কথা।

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরের বাসায় শুক্রবার মধ্যরাতে অভিযান শুরু করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। শনিবার সেই অভিযান শেষে র‌্যাব জানায়, মনিরের বাড়ি থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, বৈদেশিক মুদ্রা, নগদ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।

সকাল ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, গ্রেপ্তার মনির ৯০ এর দশকে গাউছিয়া মার্কেটে কাপড়ের দোকানে বিক্রয়কর্মী ছিলেন। পরে ক্রোকারিজ, এরপর লাগেজ ব্যবসার আড়ালে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন পণ্য দেশে আনা এবং একপর্যায়ে স্বর্ণ চোরাকারবারের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ অবৈধ পথে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে এনেছেন মনির।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, মনিরের স্বর্ণ চোরাচালানের রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর এবং ভারত। তিনি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বাংলাদেশে এনেছেন, যার ফলে রাতারাতি বনে যান কোটিপতি। তার নাম হয়ে যায় 'গোল্ডেন মনির'।

র‌্যাব জানায়, তার বাসা থেকে বিদেশি একটি পিস্তল, চারটি গুলি, চার লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চাইনিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, ১ হাজার সিঙ্গাপুরের ডলার, ২ লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম, ৬৬০ থাই বাথ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মূল্যমান ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া ৬০০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ এক কোটি নয় লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

গোল্ডেন মনিরের বাসার নিচের পার্কিংয়ে বিলাশবহুল দুটি প্রাডো গাড়ি পাওয়া গেছে। মনির এবং তার পরিবার গাড়ি দুটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু গাড়ি দুটির কোনো বৈধ কাগজ তারা দেখাতে পারেননি। তার মালিকানাধীন অটোকার সিলেকশন থেকে আরও তিনটি অবৈধ গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, মনির মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারী এবং ভূমির দালাল। তিনি একটি গাড়ির শো-রুমের মালিক। পাশাপাশি গাউছিয়াতে একটি স্বর্ণের দোকানের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া তার আরেকটি পরিচয় আছে; ভূমিদস্যু। রাজউকের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকা শহরের ডিআইটি প্রজেক্ট, পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা এবং কেরানীগঞ্জে তার দুই শতাধিকের বেশি প্লট আছে। ইতোমধ্যে মনির ৩০টি প্লটের কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা তার বাসা থেকে দুটি বিলাশবহুল অনুমোদনহীন বিদেশি গাড়ি জব্দ করেছি। যার একেকটির মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। পাশাপাশি তার কার-সিলেকশন থেকেও তিনটি বিলাশবহুল অনুমোদহীন গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মনিরের ফৌজদারি অপরাধ অনুমোদহীন বিদেশি মুদ্রা রাখা। এ জন্য বাড্ডা থানায় র‌্যাব বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করবে। এছাড়া অস্ত্র এবং মাদক রাখার জন্য অস্ত্র ও মাদক আইনেও মামলা দায়ের করবে র‌্যাব। এদিকে, স্বর্ণ চোরাকারবারের জন্য মনিরের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা রয়েছে বলেও তিনি জানান।