করোনাকালে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। চাকরিচ্যুতি ও চিকিৎসার সমস্যা এবং সেসব উত্তরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার পাশাপাশি নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোয় যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। মহামারির বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় তাই সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রতিবন্ধীবন্ধব সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা, তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, আলাদা করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা, করোনা শনাক্ত-সংক্রান্ত তথ্যে তাদের অন্তর্ভুক্তি, চাকরিচ্যুতদের সহায়তা দেওয়া এবং বাজেটে দুর্যোগকালে তাদের জন্য প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ঋণ, প্রণোদনা ও সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন তারা।

গতকাল রোববার এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, দৈনিক সমকাল ও ডেইলি স্টার আয়োজিত 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন ও জীবিকার ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব ও করণীয়' শীর্ষক ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা এ প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়। জাতিসংঘের ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট তানজিম ফেরদৌসের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন দৈনিক সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি।

স্বাগত বক্তব্যে মুস্তাফিজ শফি বলেন, 'আমরা একটি বড় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। করোনা সংক্রমণের হার আবার বাড়ছে। আমরা আবার নতুন জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি। এ সময় সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংকটে পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের সংকট আরও বেশি। আমরা একটি প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ নিশ্চিত করতে চাই। তা করতে না পারলে শুধু কভিড নয়, যে কোনো দুর্যোগে সংকটে পড়তে হবে। প্রতিবন্ধীবান্ধব রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে সবাইকে কাজ করতে হবে।'

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আলী রেজা মজিদ বলেন, বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অন্যান্য দেশের কাছে রোল মডেল। আমরা মূলত প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়ে কাজ করি। এর মধ্যে করোনা আমাদের জন্য নতুন। আমরা ব্যক্তিগতভাবে এবং সার্কুলার দিয়ে জেলা প্রশাসকদের বলেছি, প্রতিবন্ধীদের যেন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধীদের কীভাবে সহায়তা করতে হয়, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। দুর্যোগকালে লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্ণয় করা খুবই জরুরি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য পৃথকভাবে অ্যাকশন প্ল্যান করা সময়োপযোগী প্রস্তাব।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (এনডিডি ও অটিজম শাখা) শবনম মুস্তারী রিক্তা বলেন, প্রতিবন্ধিতা জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২১ লাখ। এর মধ্যে কর্মজীবী প্রতিবন্ধী ৭৮ হাজার ২৩২ জন এবং ব্যবসায় আছেন ৬০ হাজার জন। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। তিন কোটি টাকা ৬৩টি জেলায় বিতরণ করেছি। এখানে প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন থেকে এক কোটি ১০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে তাদের জন্য ১৮ লাখ টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চেয়েছি। ভাতার পাশাপাশি তাদের ক্ষুদ্র ঋণও দেওয়া হবে। এ জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। মোট ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাব। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন পাঁচ কোটি টাকা বাজেট চেয়েছে। আমাদের কমিটিগুলো সচল থাকলে এই চিত্রের আরও উন্নয়ন ঘটত। তা ছাড়া করোনার কারণে অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করতেও দেরি হয়েছে।

এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, করোনাকালে মানুষের জীবন-জীবিকা সংকটে পড়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। এপ্রিল-জুন-মে মাসে তারা খুব কষ্টে ছিলেন। এখনও তারা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি। করোনা সামনে রেখে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় অ্যাকশন প্ল্যান করা যেতে পারে। সরকার এ ব্যাপারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। মিডিয়াও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সমস্যা উত্তরণের ভালো পথ পাওয়া যাবে।

এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ফিল্ড অপারেশন ম্যানেজার মো. রফিকুজ্জামান বিশ্বাস করোনাকালে তাদের জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, কতজন মারা গেছেন এবং কতজন সুস্থ হয়েছেন, তার সঠিক কোনো সংখ্যা বা পরিসংখ্যান নেই। অথচ তাদের জীবিকা ও আয়ের ক্ষেত্রেও এ সময় বড় রকমের প্রভাব পড়েছে। লকডাউনের কারণে কাজ করতে না পারায়, মজুরি কমে যাওয়ায়, ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ রাখায় কিংবা চাকরিচ্যুত হওয়ায় নিজস্ব সম্পদ বিক্রি করে অনেকেই সংসারের প্রয়োজন মিটিয়েছেন। তারা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। নিবন্ধন কার্ড না থাকায় অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচিত হননি। করোনাকালে সরকারি-বেসরকারি সব সহায়তা কার্যক্রমে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করার কথা। কিন্তু জরিপে অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, এটি সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হয়নি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সবার সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।'

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এস এম জাহিদুল হাসান বলেন, তাদের ফাউন্ডেশন করোনাকালে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১৭ হাজার ৭৫৫ ব্যক্তির মধ্যে এক কোটি ১০ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। তাদের পরিকল্পনা আছে এটা আরও বাড়ানোর।

সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটির (সিএসআইডি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। সব দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর দিলে হবে না। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব মনিটর করা। তিন কোটি টাকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই আছেন দেড় কোটি।

অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা বলেন, আগামী বাজেটে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ প্রকল্প নিতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। না হলে তাদের বাঁচানো যাবে না। সেবা দিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা হটলাইন চালু করা দরকার। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করোনা পরীক্ষার নমুনা বাসা থেকে সংগ্রহ করা উচিত।

প্রতিবন্ধী শিশুবিষয়ক ফাউন্ডেশনের (ডিসিএফ) নির্বাহী পরিচালক নাসরিন জাহান বলেন, শহর এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করতেন তারা অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। প্রতিবন্ধী যে মানুষগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন, তারা ব্যবসা হারিয়েছেন। তাদের জীবন-জীবিকা স্থবির হয়ে পড়েছে।

কিছু সুপারিশ তুলে ধরে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাসের (বি-স্ক্যান) সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, এখনও প্রতিবন্ধীদের নিশ্চিত জীবন কিংবা সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবন্ধীদের আলাদা প্রণোদনা দেওয়া দরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি টাস্কফোর্স আছে, তাতে এদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

গ্রামাঞ্চলের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদের (এনসিডিডব্লিউ) প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার বলেন, তৃণমূলে প্রতিবন্ধীদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। করোনার সময় গ্রামাঞ্চলে যাতায়াতের ব্যবস্থা না থাকায় তারা স্বাস্থ্যসেবা পাননি। ইউনিয়ন পরিষদের সেবাও মেলেনি।

বগুড়ার এরুলিয়ার তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থার সভাপতি সালমা খাতুন জানান, তাদের এক প্রতিবন্ধী বোনকে করোনার কারণে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ তার বাবা-মা নেই। গত ছয় মাস চাকরি হারিয়ে সে খুব খারাপ অবস্থায় ছিল। আরেক প্রতিবন্ধী নারী সবজি বিক্রি করেন। তিনিও দুই সন্তান নিয়ে জীবন-জীবিকার সংকটে আছেন।

ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি মনসুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রতিটি উপজেলায় দুটি কমিটি আছে। এগুলো সক্রিয় করতে হবে। আমরা সমঅধিকারের কথা বলি। আইনও আছে। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষার মূল অভিভাবক। অথচ মার্চ মাসে এত বড় বিপদ আসার পর তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখনও সময় আছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয় করে এ কাজ শুরু করা উচিত।

করোনাকালে প্রতিবন্ধী নারীদের সমস্যা তুলে ধরে রংপুরের মধুপুরের জাগরণ প্রতিবন্ধী নারী পরিষদের সহসভাপতি ইয়াসমিন আক্তার বলেন, করোনার আগে প্রতিবন্ধী নারী যে কাজ করতেন, করোনা শুরুর পর সেই কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা তুলে ধরে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ৭নং লতাচাপলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহনাজ বেগম বলেন, আমরা জরুরি ত্রাণসামগ্রী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। তালিকা তৈরি করে এ কাজ করেছি। আগেও আমরা প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দিয়েছি। তাদের স্বাস্থ্য সচেতন করেছি।

গলাচিপার প্রতিবন্ধী সমিতি সৌহার্দ্য-এর সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, একদিকে প্রতিবন্ধী, অন্য দিকে করোনা। তার ওপর যোগ হয়েছে বন্যা-ঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যুদ্ধ করতে করতে হতাশ হয়ে পড়েছেন।