গার্মেন্ট শ্রমিক থেকে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন যুবলীগের বহিস্কৃত দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান। বেআইনি ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন এই সম্পদ। আনিস ২০০৭-০৮ সালের দিকে গার্মেন্টে কাজ করার সময় যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুকের সান্নিধ্য পান। এরপর তিনি হাতে পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনে তিনি রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে তার নামে-বেনামে শতকোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের প্রমাণ মিলেছে। তার ভোগদখলে থাকা শতকোটি টাকার সম্পদ এরই মধ্যে আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে তার প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের হিসাব পাওয়া গেছে।
তিনি যুবলীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুকের ব্যক্তিগত ক্যাশিয়ার ছিলেন। কাজী আনিস ভারত অথবা দুবাইতে অর্থ পাচার করেছেন বলেও ধারণা করছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা। দুদকের তদন্তে জানা গেছে, আনিসের বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। সংসারের অর্থ সংকট মোকাবিলায় গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে জন্ম নেওয়া আনিস ঢাকায় এসে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে গার্মেন্টে কর্মজীবন শুরু করেন।
সূত্র জানায়, ২০১০ সালের পর আনিস যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুকের ডান হাত হয়ে ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান রাতারাতি। গার্মেন্টের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রথমে যুবলীগের কেন্দ্রীয় অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক হন। ওমর ফারুকের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন করা হতো এই আনিসের মাধ্যমে।
জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেআইনি ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করলে তালিকায় কাজী আনিসের নাম আসে। পরে অনুসন্ধান করে গত বছরের অক্টোবরে তার বিরুদ্ধে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। তিনিই এই মামলাটি তদন্ত করছেন। তদন্ত পর্যায়ে আনিসের নামে যে বিত্তবৈভবের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা বিস্ময়কর। জানা গেছে, দুদকের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে, শিগগির আদালতে চার্জশিট পেশ করা হবে।
দুদকের তদন্তে আনিসের নামে শতকোটি টাকার সম্পদের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। অবৈধ টাকায় তিনি মূলত জমি কিনেছেন। গ্রামের বাড়ি বাউলিয়া ও মুকসুদপুরে ২৫টি দলিলে জমি রয়েছে তার। এসব জমি জব্দ করা হয়েছে- যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ কোটি টাকারও বেশি।
নিজ গ্রামে পুকুর ভরাট করে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে আলিশান বাড়ি নির্মাণ করছেন আনিস। তার বাবা ফায়েক কাজী দুদককে বলেছেন, এমন বাড়ি নির্মাণ করার মতো টাকা তার কাছে নেই। আনিস তার বাবার নামে মুকসুদপুর অগ্রণী ব্যাংক শাখার হিসাবে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকায় বাড়িটি নির্মাণ করা হয়।
মুকসুদপুরের দাসেরহাটে কয়েক কোটি টাকায় বাবার নামে একটি পেট্রোল পাম্প কেনেন আনিস। পরে পাম্পটি কাজী আনিসকে হেবামূলে দান করে দেন। এ প্রসঙ্গে দুদক আনিসের বাবার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা তো আনিসেরই ছিল, তাই তাকে হেবা দিয়েছি, এতে দোষ কোথায়।
দুদক সূত্র জানায়, রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে ৭-৮টি দলিলে জমি কিনেছেন তিনি। ১২-১৩ কোটি টাকা মূল্যের ওইসব জমিও জব্দ করা হয়েছে। ধানমন্ডির ১০/এ-তে ৪ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটসহ তিনটি গ্যারেজ কিনেছেন কয়েক কোটি টাকায়। রাজধানীর ওয়ারীতে কিনেছেন কয়েকটি ফ্ল্যাট। তিনি নিউ এলিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে তিনটি দোকান ও সামনের অংশে ১৩শ বর্গফুটের জায়গা কিনেছেন, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা।
গুলশান উত্তর এলাকায় ২৮ নং ল্যান্ডভিউ কর্মাশিয়াল সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় দুটি সুপরিসর দোকান কিনেছেন আনিস। এর বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। স্ত্রী সুমি রহমানের নামে ধানমন্ডির শুক্রাবাদে বিলাসবহুল একটি অট্টালিকা কিনেছেন আনিস, যার বাজরমূল্য পাঁচ কোটি টাকার অধিক। আনিসের এসব সম্পদ ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।
আনিসের অর্ধশত ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে। ওইসব হিসাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের হিসাব পাওয়া গেছে। তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ কোটি টাকা স্থিতি পাওয়া গেছে, যার লেনদেন আদালতের আদেশে স্থগিত করা হয়েছে। তার স্ত্রীর নামে ২০টির বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। কাজী আনিস ও তার স্ত্রীর আয়কর নথিও জব্দ করা হয়েছে। তারা বর্তমানে বিদেশে পলাতক। ভারত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতে তাদের বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্যগুলো যাচাই করার চেষ্টা করছে দুদক।