দলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিরুদ্ধে। পরিবারের লোকজনকে তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দলীয় বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন- এমন অভিযোগও করছেন দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই বলছেন, কেউ কেউ যুগ যুগ ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এলেও দলীয় পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এমপি রতনের কারণে।
অভিযোগ, সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরায় হয়রানি ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা শামীম আহমদ মুরাদ। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিনি। তার অভিযোগ-
রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিতেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। নারী নির্যাতন মামলার বাদী হিসেবে এজাহারে নারীর যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক নয়। সাংসদ রতন এসব হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ শামীমের। হয়রানি ও মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
রেহানা আক্তার নামের ওই নারী শামীমসহ দু'জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। অপর অভিযুক্ত হলেন- মৎসজীবী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজওয়ান আলী খান আর্নিক। এজাহারে রেহানা উল্লেখ করেছেন, তার বাসা রাজধানীর নিউমার্কেট থানাধীন এলিফ্যান্ট রোডে; বাসা নম্বর ৩২৪/১/৯। কিন্তু এলিফ্যান্ট রোডের ওই বাড়িতে কখনোই রেহানা নামে কেউ ছিলেন না এবং বর্তমানেও নেই। এ ছাড়া এজাহারে ১১ সংখ্যার মোবাইল ফোন নম্বরের স্থলে বাদীর অপূর্ণাঙ্গ মোবাইল ফোন নম্বর (১০ ডিজিট) লেখা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে- পূর্ব পরিচিত শামীম আহমদ মুরাদের কাছে চাকরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন বাদী রেহানা আক্তার। গত ১ নভেম্বর তাকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় রেজওয়ান আলী খান আর্নিকের অফিসে দেখা করতে বলেন শামীম। তিনি সেদিন সেখানে যান এবং দেখতে পান সেটি অফিস নয়, একটি বাসাবাড়ি। সেখানে শামীম ও আর্নিক তাকে শ্নীতাহানির চেষ্টা করেন। তিনি নিজেকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করে বেরিয়ে আসেন। ৯ নভেম্বর রেহানা আদালতে নালিশি মামলা হিসেবে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। আদালত বাদীর অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নেওয়ার জন্য ভাটারা থানাকে নির্দেশ দেন, কারণ ঘটনাস্থল বুসন্ধরা আবাসিক এলাকা ভাটারা থানার আওতায়।
ভাটারা থানার ওসি মোক্তারুজ্জামান সমকাল বলেন, গত ২১ নভেম্বর আদালত থেকে তিনি নির্দেশনা পেয়েছেন। ওই দিনই তার থানায় মামলা করা হয়েছে। বাদীর মোবাইল ফোন নম্বর অপূর্ণাঙ্গ (একটি ডিজিট কম) হওয়ায় তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তিনিও থানায় যোগাযোগ করেননি। এ ছাড়া বাদীর ঠিকানায় যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত বক্তব্যে শামীম আহমদ মুরাদ উল্লেখ করেন, তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীকে ধর্মপাশা উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। সাংসদ রতন তার ছোট ভাইকে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করান। প্রভাব খাটিয়ে এমপি তার ভাইকে বিজয়ী করেন। গত বছরের এক নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় শামীম পরাজয়ের কারণ হিসেবে এমপি রতনকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জে সব ধরনের চাঁদাবাজি ও লুটপাটের গডফাদার হিসেবে তার বিচার দাবি করেন। এভাবে অভিযুক্ত করায় ক্ষুব্ধ হন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এর পর থেকেই তিনি বিভিন্নভাবে ধর্মপাশা থানায় শামীমের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। পরে নারীকে দিয়ে ঢাকার আদালতে নালিশি মামলা করেছেন।
শামীম বলেন, 'রেহানা আক্তার নামে কোনো নারীকে আমি চিনি না। আমার বিরুদ্ধে মামলাটি পুরোপুরি মিথ্যা। মামলায় ঘটনার দিন হিসেবে যেদিনের কথা বলা হয়েছে, সেদিন আমি সিলেট ও সুনামগঞ্জে ছিলাম। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে সাংসদ নাটক সাজিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন।'
রেজোয়ান আলী খান আর্নিক জানান, তিনি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ তৎপরতাকে বাধাগ্রস্ত করতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এবং সুনামগঞ্জের সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ষড়যন্ত্র করে এই মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। মামলায় ঘটনার সময় দেখানো হয়েছে বেলা সাড়ে ১১টা। অথচ তখন তিনি মৎস্যজীবী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ আজগর লস্করের কাকলীর অফিসে অবস্থান করছিলেন। তদন্ত করলেই এসব সত্য বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, 'একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেই পারে। কিন্তু অভিযোগ করতে হলে তো প্রমাণ লাগে। বিরোধিতার খাতিরে তারা বিরোধিতা করছে। এটি একটি চক্র।'