মা ও অসহায় ভাইবোনদের জন্য সব সময়ই ভালো কিছু করার ইচ্ছা ছিল জাকিয়া সুলতানা রুপার। স্বপ্ন দেখতেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো চাকরি করবেন। অথচ ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। ওই রাতেই টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের রাস্তার ধার থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ধর্ষণের পর রুপাকে হত্যা করে বনে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা।
রুপা ধর্ষণ এবং হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত থেকে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আসামিদের বিচার শেষ করা হয়। যে চলন্ত বাসে এই অপরাধ হয়েছিল, সেটিও নৃশংসতার শিকার তরুণীর পরিবারকে দিতে বলেন আদালত। কোনো অপরাধের রায়ে এ ধরনের নির্দেশ সচরাচর দেখা যায় না। অথচ তিন বছর তিন মাস পার হলেও এখনও আসামিদের শাস্তি কার্যকর হয়নি। মানা হয়নি নিম্ন আদালতের রায়। রুপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান বলেন, 'নিম্ন আদালতে দ্রুততম সময়ে মামলার রায় ঘোষণা হলেও ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি খালাস চেয়ে দ প্রাপ্ত আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করে। এরপর গত ১৯ মাসেও চাঞ্চল্যকর এ মামলায় শুনানি শুরু হয়নি।'
রাজধানীর আদাবরে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে টয়লেটে গেলে পাশের কক্ষের ভাড়াটিয়া ৩৩ বছর বয়সী মো. শাহিন ধর্ষণ করে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে। এ ঘটনায় মেয়েটি বাদী হয়ে আদাবর থানায় মামলা করে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল-৫ এ বিচারাধীন। এ ঘটনায় ডিএনএ প্রতিবেদন ও চার্জশিট দাখিলের তথ্য গোপন করে চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছে আসামি। জামিনে বের হয়েই ভুক্তভোগী কিশোরীকে খুঁজছে সে। নিরাপত্তার জন্য মেয়েকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন তার মা। মেয়েটির মা বলেন, জামিন বাতিলের জন্য একই আদালতে বিষয়টি জানালেও আসামির জামিন বহাল রাখা হয়েছে। অথচ আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। মেয়েকে তুলে নেবে বলেও আসামি হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।
রুপা ও আদাবরের এই কিশোরীর মতো চলতি বছরের ৯ মে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার ১৪ বছর বয়সী কিশোরী ধর্ষণ এবং হত্যার শিকার মারুফা, ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট নির্যাতন ও হত্যার শিকার হওয়া ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রিশার মামলার রায়ও এভাবেই ঝুলে রয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে আসামিরা জামিনে বের হয়ে বাদীর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যরা ধর্ষণ এবং হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে প্রশাসন, পুলিশসহ সমাজের সকলের কাছে নিগ্রহের মুখোমুখি হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিভাবকদের কথায় জানা যায়, উচ্চ আদালতে হত্যা এবং ক্ষতিপূরণের মামলাগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। ফলে ধর্ষণ, হত্যাসহ নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলছে। এ অবস্থায় আজ বুধবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দশ মাসে ১ হাজার ২৫৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৬৭ জন শিশু। অথচ বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৭৫ জন নারী। অক্টোবর মাসে ২১৬ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মহিলা পরিষদ।
সংশ্নিষ্টদের মতে, অনেক ধর্ষণের ঘটনাতেই পুলিশ মামলা নেয় না। থানায় গেলে ভুক্তভোগীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। অনেকে মামলা করলেও আসামিকে ধরা হচ্ছে না। ধরলেও যেসব মামলায় জামিন পাওয়ার কথা নয়, সেসব মামলায়ও আসামি তথ্য গোপন করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিচ্ছে। ধর্ষণের নতুন সাজা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর গত ১৪ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো বিশ্নেষণে দেখা যায়, এ সময়ে ১৭১টি ঘটনায় ১৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন, যা আগের এক মাসের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি। আইন সংশোধনের আগে যেখানে এক মাসে প্রতিদিন গড়ে ৪ জনের কম ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন পরের মাসে তা বেড়ে দিনে গড়ে ৬ জনের বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, নারী নির্যাতনের ঘটনা ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক, অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নির্যাতনের শিকার নারী বিচার চাইতেই লজ্জাবোধ করছেন। সমাজে ঘটনাগুলো মেনে নেওয়ার মতো প্রবণতাও বাড়ছে। বিচারহীনতার কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামিরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি নৃশংসতার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে দোষীদের খুঁজে বের করা বা দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করাও সম্ভব হয় না। যে সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, তাদের দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়েছে, নানা কৌশলে অনেকে বিচার এড়িয়ে চলছে।
আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান সমন্বয়কারী জিনাত আরা হক বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে; কিন্তু আরও কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া দরকার। নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধন ২০০৩)-এর অধীনে মামলাগুলো সব সময় সঠিক সময়ে তদন্ত সম্পাদন হচ্ছে না, বিচারকার্য যেখানে ১৮০ দিনের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা সেই বিচার চলছে ৩ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত। দীর্ঘসূত্রতার জন্য সাক্ষী নিয়মিত ও যথাসময়ে হাজির করানো যায় না। এসব কারণে নির্যাতনের শিকার নারী বিচারের আশা ছেড়ে দেন এবং আসামির শাস্তি বিধান করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও পারিবারিক নির্যাতন (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ সম্পর্কে আদালতের সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সচেতনতা নেই বললেই চলে, অথচ আইনটি নারীর একটি শক্তিশালী সুরক্ষা কবজ হতে পারত।
এদিকে, দিনবদলের মেলায় বাংলাদেশের নারীরা প্রতিবাদ করতে শিখেছেন। শিখেছেন প্রতিরোধ করতে। তবুও আনুপাতিক হারে কমেনি নির্যাতন-নিপীড়ন। আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ১৯৬০ সালের এই দিনে ডোমিনিকান রিপাবলিকে বর্বরোচিত এক নির্যাতনে তিন নারী মারা যান। তাদের স্মরণ করে ১৯৮১ সালে ২৫ নভেম্বরকে নারী নির্যাতনবিরোধী দিবস ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে আসে আরেক ঘোষণা। সেবার ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর এ সময়টাকে করা হয় 'আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ'। তখন থেকে ২৫ নভেম্বর 'আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস' হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশে 'আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ' প্রথম উদযাপন করা হয় ১৯৯৭ সালে।