দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়াল। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আরও দুই হাজার ২৩০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা চার লাখ ৫১ হাজার ৯৯০ জনে পৌঁছাল। একই সঙ্গে গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই ভাইরাসে আরও ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৪৪৮ জনে। দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এ হিসাবে গতকাল মঙ্গলবার ২৬২তম দিনে এসে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়িয়ে গেল। এদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে চলমান কারোনা পরিস্থিতির এই উঠে এসেছে।
এক সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। এই হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ১০ থেকে ১২ দিন আগেও শনাক্তের হার ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ছিল। এ অবস্থায় করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে কিনা, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা চলছে। তবে দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর ঘোষণা দিতে আরও অপেক্ষা করতে চায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি। করোনা সংক্রমণের পূর্বাভাস নিয়ে গত মার্চ থেকে এই কমিটি কাজ করে আসছে। কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন সমকালকে বলেন, সংক্রমণ এক সপ্তাহ ধরে বাড়ছে। তবে এটি দ্বিতীয় ঢেউ কিনা, তা এখনও বলতে পারব না। কারণ দেশে প্রথম দফার সংক্রমণ শেষ হয়নি। প্রথম দফার সংক্রমণ শেষ হলে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নামতে হবে; কিন্তু এই শনাক্তের হার কখনও ১০ শতাংশের নিচে নামেনি। এর মধ্যেই গত এক সপ্তাহ ধরে শনাক্তের হার ১৫ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
ডা. শাহ মনির আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশগুলোতে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেভাবে শীত পড়ছে না এবং তাপমাত্রা মাইনাস ৫ থেকে ৬ ডিগ্রির নিচেও নামে না। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে এখনই বলা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে আলোচনা করছি। দু-এক দিনের মধ্যেই আমরা এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।
হঠাৎ বাড়ছে সংক্রমণ :বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় গত ৮ মার্চ। প্রথম সংক্রমণের পরবর্তী ৮৭ দিনের মাথায় আক্রান্ত ৫০ হাজার ছাড়ায় এবং পরবর্তী ১৭৫ দিনে আক্রান্ত চার লাখ ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ আক্রান্ত ৫০ হাজারে ছাড়াতে সময় লাগে ২৯ দিন। প্রথম ৮৭ দিনে মৃত্যুবরণ করেন ৭০৯ জন এবং পরবর্তী ১৭৫ দিনে মৃত্যুবরণ করেন পাঁচ হাজার ৭৩৯ জন। আগের ৫০ হাজারের তুলনায় পরবর্তী ৫০ হাজার সংক্রমণ ছাড়াতে ছয় দিন কম লেগেছে।
জোরালো প্রস্তুতির প্রয়োজন, মত বিশেষজ্ঞদের :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দেশে এপ্রিলে সংক্রমণ হার ১২ শতাংশে ওঠে। ৩১ মে সংক্রমণ ২০ শতাংশে পৌঁছাল। এরপর ২০ আগস্ট পর্যন্ত এই হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেল। ২১ আগস্ট সংক্রমণ হার কমে ১৮ শতাংশে নামে। ৩১ মে থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত পিক ছিল। করোনার এই পরিসংখ্যান গ্রাফিক্সে সাধারণত সুচালো ও মালভূমি আকৃতি এই দু'ধরনের চূড়া দেখা যায়। দেশে মালভূমির মতো চূড়া ছিল। সংক্রমণ পাঁচ শতাংশের নিচে নামলে তখন বলা যাবে প্রথম ধাপের সংক্রমণ শেষ হয়েছে। তবে এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংক্রমণের এই হার ১৫ দিন ধরে চললে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে বলে বলা যাবে। প্রথম ধাপ শেষ না হওয়ার মধ্যেও দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ শুরু হতে পারে। এজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ ঘটছে এবং প্রথম দফার চেয়ে তা ভয়াবহ পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং প্রস্তুতির বিকল্প নেই।
জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা বলেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির এই পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিভাগের জোরালো প্রস্তুতি নিতে হবে। যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে তা পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়েও জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মাস্কের ব্যবহার অধিকাংশ মানুষ মানছে না। এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় দ্বিতীয় দফায় মারাত্মক সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। সেই সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখনই করণীয় বিষয়ে রোডম্যাপ প্রস্তুত করে সে অনুযায়ী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
শুরুর ভুলত্রুটি সংশোধন করে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রস্তুত করার পাশাপাশি জনসচেতনতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, শুরুতে হাসপাতালগুলোতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন ছিল না। এখন অনেক হাসপাতালে তা সরবরাহ করা হয়েছে। আবার অনেক হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আরটিপিসিআর ল্যাবের সংখ্যা বাড়িয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জোরালো প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করছে। কেউ মাস্ক না পরলে তাকে আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় জনসচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পাশাপাশি মাস্ক ব্যবহার ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানলে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে। এজন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে।