দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির নকল পণ্য তৈরির কারখানা সরকারি সংস্থার অভিযানে সিলগালা করে বন্ধ করা হলেও এর হোতারা আবার অপরাধ করছেন। কিছু দিন বন্ধ রেখে অবৈধ কারখানা চালু করছেন তারা। বিএসটিআই ও র‌্যাবের অভিযানে বন্ধ হওয়া কয়েকটি কারখানার সঙ্গে জড়িতদের অনুসরণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
নকল ও অবৈধভাবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে এমন পণ্যের মধ্যে প্রসাধনী, ওষুধ, সিগারেট, মোবাইল হ্যান্ডসেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প উল্লেখযোগ্য। এর ফলে সরকার প্রতিবছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। বাজারে বিক্রি হওয়া প্রসাধনীর একটি বড় অংশই নকল। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি এসব প্রসাধনী ব্যবহার করে অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। নকল ওষুধের মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেশি। সরকারকে কর না দিয়ে ট্যাক্স স্ট্যাম্প নকল করে কিংবা পুরোনো স্ট্যাম্প ব্যবহার করে এবং চোরাইপথে বিদেশ থেকে এনে অবৈধভাবে বাজারজাত হচ্ছে সিগারেট। মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারেও নকলের দৌরাত্ম্য রয়েছে। নকল ইলেকট্রনিক পণ্যের আয়ু স্বল্প হওয়ায় দেশে ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত ঠেকানো না গেলে তা একদিকে দেশের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতির মুখে ফেলবে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। তাই নকল পণ্য উৎপাদন ঠেকানো সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ অবস্থায় নকল পণ্য উৎপাদকদের শাস্তি বাড়াতে হবে।
বিএসটিআই ও র‌্যাবের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মামুন মিয়া নামে এক ব্যক্তির বংশালের কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রায় ৫ কোটি টাকার নকল প্রসাধনী জব্দ করেন। এ সময় কারখানা সিলগালা করা হয়। কারখানায় না থাকায় পার পেয়ে যান মামুন মিয়া। কারখানার তিন কর্মচারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপরও মামুন মিয়ার নকল পণ্য তৈরি থামেনি। গত বছর একই এলাকায় তার কারখানা ও গোডাউনে অভিযান চালিয়ে আবার ২ কোটি টাকার নকল প্রসাধনী জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেই সময়েও তিনি ধরা পড়েননি। এরপর আবারও বংশালে আরেক জায়গায় বাসা ভাড়া করে নকল প্রসাধনী উৎপাদন শুরু করেন।
গত ৮ জুলাই করোনাকালীন তার কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্যারাসুট ব্র্যান্ডের নারিকেল তেল, প্যারাসুট বেলিফুল, কুমারিকা, ডাবর আমলা, ভাটিকাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রায় কোটি টাকার নকল প্রসাধনী জব্দ করে বিএসটিআই। এছাড়া নকল প্রসাধনী তৈরির কাঁচামাল, লেবেল, বিপুল সংখ্যক খালি বোতল, বিভিন্ন কালার ও ফ্লেভারের পারফিউম জব্দ করা হয়। বিএসটিআইয়ের মাঠ কর্মকর্তা রাশেদ আল মামুন বাদী হয়ে মামুন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করে তিন মাসের কারাদ ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তিন মাসের কারাদণ্ড শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে তিনি আবারও বেরিয়ে এসে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৌলভীবাজারের একজন ব্যবসায়ী সমকালকে জানান, মামুনের মতো অনেকেই পুরান ঢাকায় বাসাবাড়িতে নকল প্রসাধনী তৈরি করে চকবাজারে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, মৌলভীবাজারে বাসা ভাড়া নিয়ে নকল প্রসাধনী তৈরি করতেন এক ব্যক্তি। বেশ কয়েকবার অভিযানে তিনি জরিমানা দিয়েছেন। সর্বশেষ গত বছর তার কারখানায় র‌্যাব ও বিএসটিআইর যৌথ অভিযানের পর কারখানা স্থানান্তর করে এখন কেরানীগঞ্জে নিয়ে গেছেন। সেখানে পণ্য তৈরি করে চকবাজারের গোডাউন থেকে সারাদেশে বাজারজাত করছেন।
গত বছর চকবাজারে রবিন নামে এক ব্যক্তির গোডাউন থেকে জনসন, প্যারাসুট, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি, কুমারিকাসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের দুই ট্রাক নকল প্রসাধনী জব্দ করে ধ্বংস করে বিএসটিআই। এই ব্যবসায়ী রাজধানীর চকবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে নকল পণ্য তৈরি করেছেন। তিনি এক পর্যায়ে কারাখানা কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করেন। কেরানীগঞ্জের কারখানাতেও অভিযানে নকল প্রসাধনী জব্দ করা হয় এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদ দেন বিএসটিআইর ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইসঙ্গে কারখানা সিলগালা করা হয়। তিনি আবারও এই পণ্য উৎপাদন করে বাজারজাত করছেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
নকল পণ্য তৈরির আরেক হোতা সাইফ মাহমুদ ওরফে বেল্লাল। তিনি বারবার নিজের নাম ও কারখানার নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন জায়গায় নকল প্রসাধনী তৈরি করছেন। এক জায়গায় কারখানা সিলগালা করে বন্ধ করলে নতুন করে ভাড়া নিয়ে অন্য জায়গায় আবার করছেন। তার কারখানায় বিএসটিআইর অভিযানে একাধিকবার জরিমান ও পণ্য জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। ২০১৮ সালে বেল্লাল গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে নকল প্রসাধনী তৈরির অপরাধে ধরা পড়েছিলেন। সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আবারও একই অপরাধ করছেন।
শুধু ঢাকা বা এর আশপাশে নয়, নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা, রাজশাহী, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় অভিযানে নকল পণ্য তৈরির কারখানা পাওয়া গেছে। ঢাকার চকবাজার থেকে নিম্নমানের প্রসাধনী ও ব্র্যান্ডের কোম্পানির স্টিকার কিনে এনে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করতেন সাতক্ষীরার হাজী আলমগীর হোসেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর তার গুদামে ফেয়ারনেস ক্রিম, ট্যালকম পাউডার, পারফিউমসহ ৬২ ধরনের নকল পণ্য অভিযান চালিয়ে বিক্রির প্রমাণ পায় যৌথ বাহিনী। এ অপরাধে আলমগীর হোসেনকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদ দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে নকল ও ভেজাল পণ্য রোধে কাজ করেছেন র‌্যাবের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। তিনি এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, যারা নকল পণ্য তৈরি করে তারা স্থানীয় প্রভাবশালী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স ও আইনজীবীদের হাত করেই এসব করেন। ফলে অভিযানে তাদের শাস্তি দিলেও নানাভাবে পার পেয়ে যান। এই অপরাধীদের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আইনজীবীদের মাধ্যমে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবারও একইভাবে নকল পণ্য তৈরি করেন। এ ক্ষেত্রে যেসব জায়গা ও বাড়িতে করছেন ওই বাড়ি মালিকদের শাস্তির আওতায় আনা গেলে নকল পণ্য বন্ধ করা সহজ হবে।

প্রসাধনী পণ্য, ওষুধ, বৈদ্যুতিক তার, ইলেকট্রনিকসহ নানা পণ্যে একই ব্যক্তি বারবার একই অপরাধ করছেন এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানান সারোয়ার আলম। তিনি বলেন, প্রসাধনী পণ্য ও ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তি দেওয়ার সুযোগ আছে। তবে বৈদ্যুতিক তারসহ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার আইন প্রয়োগ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে খুবই কম শাস্তির বিধান আছে। এই আইনে শাস্তি বাড়ানো উচিত। এছাড়া নকল পণ্যের মামলাগুলোর জন্য আদালতে আলাদা সেল গঠন করা প্রয়োজন। যাতে অপরাধীরা পার না পায়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিএসটিআইর উপপরিচালক রিয়াজুল হক সমকালকে বলেন, বিএসটিআইর অভিযানে মামুন ও বেল্লালদের মতো একই ব্যক্তি একাধিকবার ধরা পড়েছেন। এসব অপরাধী এক জায়গায় কারখানা সিলগালা করে বন্ধ করে দেওয়ার পরে আবার অন্য জায়গায় কারখানা চালু করেছেন। তিনি বলেন, প্রথমবার ধরা পড়লে সাধারণত এক লাখ টাকা বা তার নিচের কোনো অঙ্কের জরিমানা করা হয় এবং দুই থেকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার ধরা পড়লে জরিমানা ও কারাদণ্ড বাড়ানো হয়। আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি ২ লাখ টাকা জরিমানা ও দুই বছরের জেল।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের লিগ্যাল ডিরেক্টর ও কোম্পানি সচিব এস.ও.এম. রাশেদুল কাইয়ুম সমকালকে বলেন, নকল পণ্য উৎপাদন বন্ধ হলেও বারবার আবার চালু হচ্ছে। আইনে শাস্তি কম থাকলে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে শাস্তি বাড়ানো উচিত। যাতে ভোক্তারা ক্ষতিকারক নকল পণ্যের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পান। তিনি আরও বলেন, ইয়াবা বন্ধে যেমন কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সরকার সফল হয়েছে, তেমনি নকল প্রসাধনী বন্ধে কঠোর হওয়া দরকার। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দীর্ঘ দিন ধরে নকল বৈদ্যুতিক তারের ব্যবসা করছে আজিজ কেবল নামে একটি কোম্পানি। আগে পুরান ঢাকায় নকল তার তৈরি করতেন এ কোম্পানির মালিক। কয়েকবার অভিযানের পর কারখানা নিয়ে যান মাতুয়াইলে। সেখানে অভিযানে গত ৪ নভেম্বর বিআরবি, পলি, বিজলী, বিবিএসসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল বৈদ্যুতিক তার তৈরির প্রমাণ পায় র‌্যাব। এসব পণ্য তৈরির অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এমনভাবে অনেক কারখানা কোটি কোটি টাকার নকল বৈদ্যুতিক তার তৈরি করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়লেও একই ব্যক্তি আবার এ কাজ শুরু করছেন। ঘুরেফিরে এসব পণ্যের বেশিরভাগই তৈরি হচ্ছে কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, মৌলভীবাজার, নয়াবাজার, চুড়িহাট্টা, পাটুয়াটুলী, চকবাজার, লালবাগ ও ইসলামপুরে।