সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামসহ কাজের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কোনো ঠিকাদারকে একইসঙ্গে একাধিক প্রকল্পের কাজ দেওয়া যাবে না। চলমান প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে তারপর ওই ঠিকাদারকে অন্য কাজের নির্মাণাদেশ দেওয়া যেতে পারে। তিনি জানতে চেয়েছেন কোন প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কতটি প্রকল্পের নির্মাণ কাজ করছে। প্রকল্পগুলোর সার্বিক অগ্রগতি, কোন অবস্থায় আছে তা বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এই নির্দেশনা দেন তিনি। একনেক চেয়ারপারসন হিসেবে এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বৈঠকে সংযুক্ত হন তিনি।
দেশের নাগরিকদের বৈধ পরিচয়পত্র ও স্মার্টকার্ড দিতে নির্বাচন কমিশনের অধীনে 'আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস' প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়সহ বৈঠকে সাতটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৭০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এই ব্যয়ে সরকারি অর্থায়ন ৬ হাজার ৪৫৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বাকি ৪ হাজার ২৪২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ। একনেক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এবং অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য সরকারের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে সংশ্নিষ্ট সচিবরাও প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
ঠিকাদার প্রসঙ্গ : ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা সচিব জানান, ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ছয় বছরের প্রকল্প প্রস্তাব থেকে সময় কমিয়ে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঠিকাদারদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যাতে একসঙ্গে একাধিক কাজ না পায়, সেটা দেখতে হবে। বিদ্যমান কাজ শেষ হলে পরবর্তী কাজ পাবে। সচিব জানান, এতে একদিকে যেমন সময়মতো প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হবে, তেমনি নতুন নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে।
সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে মহাসড়কের মাঝপথে বিশ্রামগার নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বিশ্রামাগারে চালক এবং যাত্রীরা যাতে সুবিধামতো বিশ্রাম নিতে পারেন। এ ছাড়া টেকসই সড়ক অবকাঠামোর জন্য সড়কের পাশে গাছ লাগানোর নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। কক্সবাজারের খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই প্রকল্পে সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যাতে জলবায়ুদুর্গতরা অগ্রাধিকার পায়।
এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা সচিব জানান, ঘাস উন্নয়ন প্রকল্পে ৩২ কর্মকর্তার বিদেশ সফর প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে একনেকের বৈঠকে। এ প্রসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ কমানোর জন্য সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
টিকা সংরক্ষণ : করোনার টিকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, করোনা টিকা দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। সিরিঞ্জ এবং তুলার নিরাপদ ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেশে আসার পরে মজুদ, সরবরাহ ও সঠিকভাবে বিতরণের জন্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সঠিক তাপমাত্রায় ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও সরবরাহ করতে তিনি কোল্ড চেইন ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করতে বলেছেন। সেইসঙ্গে টিকা কর্মসূচি-পরবর্তী বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন।
'কোল্ড চেইন' হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সঠিক তাপমাত্রায় জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, উৎপাদন থেকে শুরু করে মানবদেহে প্রয়োগ পর্যন্ত ভ্যাকসিনকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে গেলে বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, হিমাঙ্কের নিচে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ রাখা সম্ভব।
যেহেতু ডব্লিওএইচও এখনও কোনো ভ্যাকসিন অনুমোদন দেয়নি, তাই এর সংরক্ষণ ও সরবরাহ প্রক্রিয়া কী হবে তা জানা যায়নি।
গত ৫ নভেম্বর সরকার ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই করেছে। দেশে বিদ্যমান 'কোল্ড চেইন'-এর কথা বিবেচনায় নিয়ে সেরামের কাছ থেকে তিন কোটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার কথা।
স্মার্টকার্ড : দেশের নাগরিকদের বৈধ পরিচয়পত্র ও স্মার্টকার্ড দিতে নির্বাচন কমিশনের অধীনে 'আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস' প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'দেশের ১৪ বছরের বেশি বয়সী সকল বাংলাদেশির ছবিসহ ভোটার আইডি ও স্মার্টকার্ড তৈরির জন্য এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।'
এই পর্যায় আগামী মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, এর আগে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রকল্পটির ওই পর্যায় এখনও চলমান রয়েছে, সেটি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে।
তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের মতোই জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ এবং ছবিসহ ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করা হবে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য যাবতীয় তথ্য প্রদান করা হবে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'এই প্রকল্পের আওতায় সারা বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ৪০টি দেশে বিশেষ করে যেসব দেশে তুলনামূলক বেশি বাংলাদেশি অবস্থান করছেন, সেসব দেশেও পরিচালনা করে সেখানকার বাংলাদেশিদের তথ্য নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে ভোটার তালিকাভুক্ত করা হবে।'
তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মূল কাজ হচ্ছে স্মার্টকার্ড উৎপাদন এবং নাগরিকদের মধ্যে বিতরণ করা। 'প্রকল্পটির এই পর্যায়ের আকর্ষণ হচ্ছে এবার স্মার্টকার্ড দেশেই উৎপাদন করা হবে। চলমান স্মার্টকার্ড ফ্রান্স থেকে আমদানি করা। এখন নতুন প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশেই স্মার্টকার্ড উৎপাদন করা হবে। আমরা হিসাব-নিকাশ করে দেখেছি যে, স্মার্টকার্ড দেশে উৎপাদন করলে খরচও কম হবে।'
১০ হাজার ৭০২ কোটি টাকার ৭টি প্রকল্প অনুমোদন : অনুমোদিত বাকি প্রকল্পগুলো হচ্ছে, প্রাণী পুষ্টি উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর, খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকলপ্প, ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর অ্যান্ড রিজওনাল এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রাম, উইকেয়ার ফেজ-১ : ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক (এন-৭) উন্নয়ন প্রকল্প ও পায়রা বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধাদির উন্নয়ন ও শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি স্থাপন-১ পর্যায়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ হাছান মাহমুদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক, পরিবেশ এবং বন ও জলবায়ুমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন, প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।