লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজন। পাশাপাশি সংবিধান ও আইনের আলোকে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা রুখে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
গতকাল বুধবার সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। 'কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা :১৬ দিনের গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের গুরুত্ব' শীর্ষক এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও দৈনিক সমকাল। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিউম্যান রাইটস প্রোগ্রামের সার্বিক সহযোগিতায় এই সভার আয়োজন করা হয়।
মতবিনিময় সভায় আলোচকরা বলেন, করোনা মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতা বরং আরও বেড়েছে। এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারাবিশ্বের। অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোর পরিসংখ্যানেও এমন তথ্য মিলেছে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক বন্ধন আরও জোরদার করা প্রয়োজন। যাতে দেশের যে কোনো প্রান্তেই সহিংস ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে জনমত উচ্চকিত হয় এবং ঘটনাগুলো রুখে দেওয়া যায়।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী অ্যারোমা দত্ত এমপি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ড. কামালউদ্দিন আহমেদ, জেসমিন আরা বেগম, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের পরিচালক ড. আবুল হোসেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহিন আনাম, মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রেসিডেন্ট সালমা আলী, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পারভিন আক্তার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (আইনি সহায়তা) উপ-পুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন, এসডিজির প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাবিনা ইয়াসমিন লুবনা, এইচআরপি-ইউএনডিপি ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর তাসলিমা ইসলাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক গোলাম মনোয়ার কামাল, কাপেং ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়ক ফালগুনী ত্রিপুরা, তরুণ প্রতিনিধি সুমিতা রবিদাস ও ইমন আলী।
সূচনা বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, 'আগামী ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখে ১৬ দিনব্যাপী লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধে ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে সমকালও এই প্রচারাভিযানে যুক্ত হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত প্রতিরোধ বা উদ্যোগ জরুরি। এক্ষেত্রে ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার মামলাগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তদন্ত হচ্ছে কিনা- এগুলো দেখতে হবে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও নিরসন করা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একসময় আমরা ধর্ষণমুক্ত 'একমাত্র বাংলাদেশ'- এই ঘোষণাটি দিতে চাই। আশা করি সবার প্রচেষ্টায় সেটি আমরা পারব। এর আগেও আমরা বড় বড় কঠিন কাজ করে জয়ী হয়েছি, এই লড়াইয়েও আমরা সফল হব।'
সভাপতির বক্তৃতায় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন করার পরে মনে করেছিলাম সহিংসতার ঘটনা কমবে। কিন্তু যে তথ্য-উপাত্ত মিলছে, তাতে এসব কমার কোনো লক্ষণই নেই। বলা যায়, ধর্ষণ ও সহিংসতা মহামারির আকার ধারণ করেছে।' তিনি বলেন, 'ধর্ষণ মামলার বিচারে ডিএনএ টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কাজে লাগালে বিচারকাজ ত্বরান্বিত হবে। বাংলাদেশ শুধু নারীর ক্ষমতায়নে শ্রেষ্ঠ নয়, তা নয়; নারীর নিরাপত্তাও এখানে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত- এ দেশকে আমরা সেই জায়গায় নিতে চাই।'
অ্যারোমা দত্ত এমপি বলেন, 'নারীর প্রতি সহিংসতার সমস্যাটা সামগ্রিক। এটি প্রত্যেকেরই মনোবেদনা এবং রক্ষক্ষরণের জায়গা। সরকার এবং বেসরকারি সংস্থা, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যমসহ আমরা সবাই চেষ্টা করছি- তার পরও কোথাও একটি সমন্বয়ের অভাব থেকে যাচ্ছে। তাই এখন থেকেই একটি গাইডলাইন তৈরি করে একক প্ল্যাটফর্মের আওতায় কীভাবে কাজ করা যায়, তা ভেবে দেখা উচিত।' তিনি প্রত্যাশা করেন, বিষয়গুলো যেন শুধু এই আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বছরব্যাপী যেন এই কার্যক্রম চলমান থাকে।'
ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, 'নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য সমস্যার মূলে গিয়ে দেখতে হবে, এর প্রকৃত কারণ কী। সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রোধ এবং সম্পত্তিতে তাদের সমানাধিকারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।'
অধস্তন আদালতে বিচারক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জেসমিন আরা বেগম বলেন, 'আমাদের দেশে যেসব ধর্ষণ মামলা হয়, সেগুলোর মধ্যে কিছু আছে সরাসরি ধর্ষণ। আবার কিছু ধর্ষণ আছে- প্রেমের সম্পর্ক থেকে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, ধর্ষককে ভিকটিম বিয়ে করে ফেলেছে। তখন তার বিচার কীভাবে হবে? পাড়া-মহল্লায় যে সামাজিক সম্প্রীতি ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এসব ব্যাপারে সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও বাড়াতে হবে। আমাদের আইনের অভাব নেই। এখানে সমস্যা হলো তার প্রায়োগিক ব্যবহার। এদিকেও নজর দিতে হবে।'
আবুল হোসেন বলেন, 'সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে যে যেখানে আছেন সেখান থেকে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে সংসদে যারা প্রতিনিধিত্ব করেন অর্থাৎ এমপিদের একটি বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। সেইসঙ্গে সরকারের কাঠামো অর্থাৎ সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, স্থানীয় সরকারের কাঠামো এবং বেসরকারি সংস্থা ও ইমামসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকেই ভূমিকা রাখতে হবে। সিভিল সোসাইটির ভূমিকাও জরুরি। গণমাধ্যমকে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বেশি বেশি রিপোর্ট করতে হবে। তাহলেই সবাই মিলে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারব।'
শাহীন আনাম বলেন, 'নারী নির্যাতন মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে হওয়ার কথা। সেখানে তদন্তই কেন ওই সময়ে শেষ হচ্ছে না, সেজন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে কখনো শাস্তি পেতে হয়নি। নারী কোনো পণ্য নয়। তাকে মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু পারিবারিক সহিসংতা রোধ করা অনেকাংশে সম্ভব নয়, যার একটি কারণ- অনেক নারী বলেন, স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল খাব কী? আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবেই কিছু করতে পারব। আশা করছি, আগামী বছর যাতে এসব কথা আর বলতে না হয়।'
সালমা আলী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণ বিশেষ করে যেগুলো অস্বাভাবিক ধর্ষণ, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। শুধু মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে নারীর প্রতি সহিসংতা ঠেকানো সম্ভব নয়। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এক্ষেত্রে অনেক। তাদের নারীর প্রতি সহিসংতা রোধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। তেঁতুলতত্ব নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ সেখানে করা হয় না- এ থেকে বোঝা যায় রাজনৈতিক নেতারা নারীদের কোন চোখ দেখেন। ধর্ষণ রোধে হাইকোর্টের কয়েকটি নির্দেশনা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
পারভীন আকতার বলেন, লিঙ্গবৈষম্য যদি কমাতে হয় তাহলে সবার আগে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আর এই পরিবর্তনের পদক্ষেপ কিন্তু প্রথমেই ঘর অর্থাৎ পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। এরপর আসবে সমাজ। এখানে যারা ভূমিকা রাখতে পারেন, তাদের নিয়েই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অধিদপ্তর কাজ করে চলেছে। নিয়মিত সেখানে সভা-বৈঠক করা হয়। সেখানে নারীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিতেই জোর দেওয়া হয়।
ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থাকেন, তারা থানায় আসতে আগ্রহী নন। অবশ্য এখন আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। এটি যাতে আরও প্রায়োগিক হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। তা হলে নারীরা আস্থা খুঁজে পাবেন।
মোংলায় সরেজমিন হরিজন সম্প্রদায়ের এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, 'তারা অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সমন্বিত পদক্ষেপ কীভাবে নেওয়া যায় আমাদের তা নির্ধারণ করতে হবে। আইনের বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি আইনে কোনো সমস্যা আছে কিনা বা তারা এর সুফল পাচ্ছেন কিনা তাও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।'
তাসলিমা ইসলাম বলেন, 'জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে দেখা যায় মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতে করোনা মহামারির সময়েও নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা চিহ্নিত করতে হলে আরও গভীরভাবে কাজ করতে হবে।' তার মতে, নারীর প্রতি সহিসংতা রোধে শিক্ষা ও সচেতনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। নারী নির্যাতনের তথ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে হবে- একটি সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে। তা হলেই পরিস্থিতি অনুধাবন করে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
গোলাম মনোয়ার কামাল বলেন, গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৩৫০ জন। এই চিত্র কিন্তু পূর্ণাঙ্গ নয়- কারণ এই তথ্যের জন্য আমরা নির্ভর করছি গণমাধ্যমের ওপর। তাই এখন সময় এসেছে, কীভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যায়, এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
কাপেং ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়ক ফালগুনী ত্রিপুরা বলেন, সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে আদিবাসী শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তা ছাড়া আদিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে, এমন সংগঠনগুলোও কিন্তু এখন আর্থিক সংকটে রয়েছে। এ অবস্থায় তারা কীভাবে আদিবাসী নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
সুমিতা রবিদাস বলেন, বিশ্বব্যাপী নারীদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চলছে। এটি আমাদের ভাবায়। বিশ্বের অনেক দেশই এ নিয়ে কাজ করেছে। আশা করব, আমাদের গুণীজনরা উদ্যোগ নেবেন যাতে আমাদের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে তোলা যায়।
মো. ইমন আলী বলেন, করোনায় বাল্যবিয়ে বেড়েছে। এক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম যদি এগিয়ে আসে, তাহলে বাল্যবিয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।



বিষয় : ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা

মন্তব্য করুন