ফ্লেভার, রং ও স্পিরিট মিশিয়ে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন করছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গত জুলাইয়ে মিটফোর্ড এলাকায় এ চক্রের নয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তাদের জরিমানাও করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে করোনার নকল সুরক্ষাসামগ্রী জব্দ করা হচ্ছে। এতে প্রমাণ করে, করোনাকে পুঁজি করেই এক শ্রেণির অসাধু মুনাফালোভীর শিকড় শক্ত হচ্ছে।
করোনাকালে স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লাভসসহ নানা ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী মানুষের জীবনযাপনে নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। বাজারের এই চাহিদার সুযোগে নামিদামি কোম্পানির লেভেল লাগিয়ে অপরাধী সিন্ডিকেট নকল সুরক্ষাসামগ্রী বাজারজাত করছে। নকল পণ্য আসল হিসেবে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, সংক্রমণের পর থেকে এখন পর্যন্ত নকল করোনাসামগ্রী প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে ২৬টি অভিযান চালিয়েছে সংস্থাটি। মামলা করেছে ৮১টি। সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছে ২৪ জনকে। তবে জেল-জরিমানা ও মামলার পরও জালিয়াত চক্রের সদস্যরা বেপরোয়া। দিনের পর দিন যেন করোনার নকল পণ্যের বাজার বড় হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সমকালকে বলেন, যারা করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারিকে পুঁজি করে অল্প সময়ের মধ্যে অধিক মুনাফা অর্জনের অপপ্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাব কঠোর ব্যবস্থা নেবে। করোনার নকল সুরক্ষাসামগ্রীর বিরুদ্ধে অভিযান আরও বেগবান হবে। এই চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য-অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. নাসরিন সুলতানা সমকালকে বলেন, করোনা থেকে বাঁচতে হলে প্রতিরোধের ওপর নজর রাখা জরুরি। কিন্তু যেসব সামগ্রী ব্যবহার করে প্রতিরোধ করা হবে তা যদি নকল হয়, তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। নকল পণ্য তৈরি করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া আমাদের চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে। করোনার মতো মহামারির সময় কেউ কেউ মানুষকে এই ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। বিবেক ও আর নৈতিক মানদণ্ড না বাড়ালে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন।
দেশে আগে থেকেই প্রসাধনী, ওষুধ, সিগারেট, মোবাইল ফোনসেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস, বৈদ্যুতিক তার, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্পসহ নানা পণ্য নকল হচ্ছে। এর ফলে সরকার প্রতি বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। করোনা সুরক্ষাসামগ্রীও নকলবাজদের হাত থেকে রেহাই পেল না। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত ঠেকানো না গেলে তা একদিকে দেশের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতির মুখে ফেলবে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। তাই নকল পণ্য উৎপাদন ঠেকানোয় সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ অবস্থায় নকল পণ্য উৎপাদনকারীদের শাস্তি বাড়াতে হবে।
সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনাকালে রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় নকল সুরক্ষাসামগ্রীর গোপন কারবার খুলে বসেছে অনেকে। অনেক এলাকায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্যানিটাইজার, গ্লাভস, পিপিই, জীবাণুনাশক স্প্রে ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। পুরান ঢাকা, কামরাঙ্গীরচর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে নকল করোনাসামগ্রী তৈরির কারখানার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। গত মে মাসে চাঁদপুরের একটি চক্রের সন্ধান পায় জেলার ডিবি পুলিশ। ওই ঘটনায় মো. কলিম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার হেফাজত থেকে এক লিটারের ৫০০ কনটেইনার ভেজাল ও নকল স্যাভলন, ৫০০ পিস হ্যান্ডওয়াশ ও স্যানিটাইজার পাওয়া গিয়েছিল।
র‌্যাব সূত্র জানায়, নকল স্যানিটাইজার তৈরির সঙ্গে জড়িত পুরান ঢাকার একটি চক্রকে তারা শনাক্ত করেছিল। তাদের কাছ থেকে প্রায় চার হাজার পিস হ্যান্ডরাব, ৫০ কেজি ওজনের ১৪টি ড্রামে খোলা হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং দুই হাজার লিটার জি লিকুইড হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্দ করা হয়। নকল পণ্য বিক্রির কারণে লক্ষ্মী পারফিউমারির মালিক জনিকে দুই লাখ টাকা, কামাল পারফিউমারি ও কেমিক্যালের মালিক মো. কামাল হোসেনকে পাঁচ লাখ টাকা, দীন পারফিউমারির মালিক তাজুল ইসলামকে ৫০ হাজার টাকা, সুমি এন্টারপ্রাইজের মালিককে দুই লাখ টাকা, আজতারা পারফিউমারির মালিক শামসুল ইসলামকে এক লাখ টাকা, জসিম পারফিউমারির মালিক মো. সেন্টুকে এক লাখ টাকা, দি বোরহান পারফিউমারির মালিক আবদুর রহমানকে ছয় লাখ টাকা এবং বোরহান পারফিউমারি হাউসের মালিক মোহাম্মদ রেজাউলকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া কামাল কেমিক্যালসের মালিক কামালকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং একই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আবু কাওসারকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডসহ দুটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়।
গত ১১ আগস্ট বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার, অনুমতিবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে অনিক মেডিক্যাল হলের মালিক জামাল হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হয় নকল সামগ্রী। ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেন গৌরনদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারিহা তানজিন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আমাদের দেশে সাধারণত যে পণ্যের চাহিদা বেশি, তাকে টার্গেট করেই প্রতারক চক্র গড়ে ওঠে। রাতারাতি তারা আসল পণ্যের মতো লেভেল তৈরি করে নকল পণ্য তৈরি করা শুরু করে দেয়। করোনা সংক্রমণের পর স্বাভাবিকভাবে সুরক্ষাসামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। তাই বিভিন্ন চক্র নকল পণ্য তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে। ওই কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলামটরে জহুরা টাওয়ারে একটি চক্রের খোঁজ পায় পুলিশ। যারা সাধারণ মাস্ক এন-৯৫ বলে কয়েকগুণ দাম বাড়িয়ে বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করছিল। ওই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তারা হলো- আনোয়ার হোসেন, অমিত বসাক, শোয়াইব ও শুভ। একই মাসে রাজধানীর পান্থপথে বিপুল পরিমাণ নকল গ্লাভস ও গাউন জব্দ করে র‌্যাব। ওই ঘটনার সূত্র ধরে এএসএম ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নকল ও মানহীন পণ্য মজুদের খবর পাওয়া যায়। এসব পণ্য বিক্রির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক এএসএম মুসাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
দীর্ঘদিন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করে আসছিলেন সারওয়ার আলম। সম্প্রতি তাকে বদলি করা হয়েছে। তবে এখনও র‌্যাব থেকে বিদায় নেননি তিনি। গত কয়েক মাসে করোনার নকল সামগ্রীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযানে অংশ নেন সারওয়ার আলম। নকল করোনাসামগ্রীর ব্যাপারে তার ভাষ্য হলো, এসব দুর্বৃত্তদের রুখতে হলে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতেই হবে। নানাভাবে নকল পণ্যের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করাও জরুরি। কারণ নকল পণ্যে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিদেশি পণ্যের লোগো লাগিয়ে অনেকে মাস্কসহ অনেক পণ্য তৈরি করে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ বিদেশ থেকেই প্রায়ই হুবহু এমন মোড়ক তৈরি করে আনছেন, তা থেকে আসল-নকল পার্থক্য করা কঠিন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল হক সমকালকে বলেন, যারা নকল করোনাসামগ্রী তৈরি করছেন তাদের ব্যাপারে গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই অভিযান চালানো হবে।