মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতের আদালতে বিচার চলছে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের। আসছে জানুয়ারিতে রায় ঘোষণা করা হবে। দোষী প্রমাণিত হলে ৭ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে তার। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে- সাজা হলে তার এমপি পদ থাকবে কিনা।

সাজা হলে এমপি পদ হারাবেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন আইনজ্ঞ। আর কয়েকজন আইনবিদ বলছেন, বিষয়টি ধোঁয়াশাপূর্ণ। কারণ সংবিধানে বিদেশে সাজার বিষয়টি উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একজন সংসদ সদস্য নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত হলে তার সদস্য পদ বাতিল হবে। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী, তার সাজার রায় স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এমপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না। এ ছাড়া দণ্ডবিধির ৩ ধারা অনুযায়ী কোনো বাংলাদেশি অন্য দেশে কোনো অপরাধ করলে এখানে তার বিচার করা যাবে। সে ক্ষেত্রে আইনের বিধান এমনভাবে প্রয়োগ হবে, যেন ওই অপরাধ বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে।

কুয়েতে তিনটি অভিযোগে বিচার চলছে এমপি পাপুলের- অর্থ পাচার, মানব পাচার ও যৌন হয়রানি। দেশটির আইন অনুযায়ী, অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ৭ বছরের সাজা হবে; মানব পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা ১৫ বছর। আর যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে মানব পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

২৬ নভেম্বর কুয়েতের আদালত শুনানি শেষে রায়ের তারিখ ঘোষণা করেছেন। কুয়েতে মানব পাচার ও অর্থ পাচার মামলার রায় আগামী ২৮ জানুয়ারি ঘোষণা করা হবে।

এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে আদালতে যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা হয়েছে, তাতে তার সাজা হওয়ার বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত বলে কুয়েতের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, কুয়েতে এমপি পাপুলের সাজা হলে সংবিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। দেশে বা বিদেশে যেখানেই হোক; একই বিধান। ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের সাজা হলেই সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। তবে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পদ থাকবে। সবকিছু নির্ভর করছে বিচারের ওপর।

বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন সমকালকে বলেন, কুয়েতের আইনে সাজা হলে আমাদের দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী বিশ্নেষণ করে দেখতে হবে। যদি দেখা যায়, আমাদের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে, সে ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য পদ থাকবে না।

আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মানিক সমকালকে বলেন, যদি নৈতিক স্খলনজনিত কারণে সংসদ সদস্য পাপুলের সাজা হয়, সে ক্ষেত্রে তিনি পদ হারাবেন। একজন আইন প্রণেতা হয়ে বিদেশে অর্থ পাচার, মানব পাচার মারাত্মক অপরাধ।

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সমকালকে বলেন, এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে বিদেশের আদালতে সাজা হলে নৈতিক স্খলনজনিত কারণে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাবেন- এমন কথা সংবিধানে বলা নেই। ওই দেশের সাজা আমাদের দেশে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, তার জন্য উচ্চ আদালতের আইনি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদিও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, ফৌজদারি অপরাধে যেখানেই সাজা হোক; সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। কেননা, সংবিধানে দেশ-বিদেশ কোনো উল্লেখ নেই। সে ক্ষেত্রে কোনো সংসদ সদস্যের সাজা হলেই স্পিকার ব্যবস্থা নেবেন। অন্যথায় হাইকোর্টে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, পাপুল কুয়েতের কয়েকটি ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি দিনার হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অপরাধ তদন্ত সংস্থা তথ্য পেয়েছে। এই অর্থের একটা বড় অংশ তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে পাচার করেছেন। এ ছাড়া পাপুল কুয়েতে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি কুয়েতি দিনার (এক হাজার ৫১ কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়েছেন। বিচারকমণ্ডলী ১৩ প্রবাসীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা তাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে পাপুলের কঠোর শাস্তির পাশাপাশি পাপুলের এমপি পদ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

চলতি বছর ৬ জুন কুয়েতের মুশরিফ এলাকায় সিআইডি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন কুয়েতের রেসিডেন্স পারমিটধারী কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। গ্রেপ্তারের পর তাকে সে দেশের স্থানীয় আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েক দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়। সে দেশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা তার বিরুদ্ধে মানব পাচার ও ৫৩ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার (প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা) পাচার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে। এ ছাড়া পাপুলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে কুয়েতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর পাপুলের মামলার বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। পাপুলের সঙ্গে অভিযুক্ত হিসেবে রয়েছেন কুয়েতের দুই সংসদ সদস্য সাদুন হাম্মাদ আল-ওতাইবি ও সালাহ আবদুলরেদা খুরশিদ। এমপি পাপুলের কাছ থেকে 'ঘুষ নিয়ে' অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। পাপুল সে দেশের কারাগারে বন্দি আছেন।