স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। শুধু প্রাসাদোপম বাড়ি নয়, গড়েছেন নামে-বেনামে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। গণপূর্ত ও রাজউকে বহুকাল ধরে ছিল তার একচ্ছত্র প্রভাব। প্রশাসনের অসাধু অনেক কর্মকর্তাকে 'ম্যানেজ' করে জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। যাদের ম্যানেজ করতে পারতেন না তাদের অনেককে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার 'ক্ষমতা' ছিল তার। নিজের একটি প্রজেক্টের ফাইল অনেক দিন আটকে থাকায় সর্বশেষ গণপূর্তের এক বড় কর্মকর্তাকে তার পদ থেকে দ্রুত সরানোর ছক ছিল মনিরের। অর্থ আর নিজের প্রভাব খাটিয়ে ওই কর্মকর্তাকে সরিয়ে নিজের পছন্দের লোক বসিয়ে স্বার্থ হাসিল করার ষড়যন্ত্র করেন তিনি। ওই কর্মকর্তাকে সরানোর জন্য মনিরের এই ছকে জড়িত ছিল একটি বড় কনস্ট্রাকশন ফার্মও। মনির এবং ওই ফার্মের স্বার্থ জড়িত ছিল নতুন সেই প্রজেক্টে। গণপূর্তের ওই কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেই ধরা পড়লেন গোল্ডেন মনির। সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র গতকাল সমকালকে এই তথ্য জানায়।

তিন মামলায় ১৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে মনির হোসেনকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে গত ২০ নভেম্বর মনিরকে তার মেরুল বাড্ডার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য।

সূত্র মতে, মনির জিজ্ঞাসাবাদে জানান, এক কথায় হাতে তুড়ি দিয়ে সব কাজ বাগিয়ে নিতেন তিনি। অর্থ যেভাবে দেদার কামিয়েছেন, আবার খরচও করেছেন বিনা হিসাবে। নিজের কাজের জন্য কাউকে পথের কাঁটা মনে করলে তাকে পদ থেকে সরাতে সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করতেন তিনি। বিভিন্ন সময় নিজের ক্ষমতা ও আর টাকার জোরে অনেককে সরাতেও সক্ষম হন। তবে কাজ আদায় করতে টোপ দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের 'মাথা কিনে নেওয়ার' নীতি ছিল তার।

মনির জিজ্ঞাসাবাদে রাজউক ও গণপূর্তের বিভিন্ন কাজ জালিয়াতি করে হাতিয়ে নেওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি এও জানান, একা নন এমন দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা সুবিধা নিয়ে তার ফাইল পাস করিয়ে দিতেন। বিভিন্ন আমলে তার সুবিধাভোগী কয়েকজন কর্মকর্তার নামও প্রকাশ করেছেন মনির।

গোয়েন্দারা বলছেন, গোল্ডেন মনির ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে তা জানতে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিকভাবে যেটা বের হয়েছে তা হলো- ৪টি ব্যাংকের ২৫টি হিসাবে ৯৬০ কোটি টাকা রয়েছে মনিরের। এছাড়া বিদেশেও টাকা পাচার করেছেন তিনি। বর্তমানে তদন্তাধীন তিনটি মামলার বাইরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মনিরের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সংশ্নিষ্ট একজন পদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, জীবনের শুরুতে গাউছিয়ার দোকানে একজন বিক্রয় কর্মী থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন- এ কাহিনি পুরোটাই জানিয়েছেন মনির। এরপর তিনি মৌচাকের একটি ক্রোকারিজের দোকানে কাজ শুরু করেন। পরে মৌচাকেও একটি স্বর্ণের দোকান খুলে বসেন। পরে তার সঙ্গে পরিচয় হয় 'লাগেজকাটা পার্টি'র সদস্যদের। তখন থেকে তিনি লাগেজের আড়ালে চোরাই পথে স্বর্ণ এনে কালো কারবার শুরু করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মূলত তখন থেকেই গণপূর্ত আর রাজউকে তার প্রভাববলয় তৈরি হয়। বিভিন্ন সময় নানা জালিয়াতি ও অনিয়ম করে কয়েকশ প্লট হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন মনির। তবে তিনি এও দাবি করেন, ২৫-৩০টি প্লট বাদে বাকি সব প্লট অন্যদের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছেন।

জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কয়েকজন সহযোগীর নামও জানিয়েছেন মনির। যার মধ্যে রয়েছেন গুলশানের মোহাম্মদ সালেহ, ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর শফিকুল ওরফে সোনা শফিক, রিয়াজ উদ্দিন ও হায়দার। তাদের সঙ্গে নিয়ে উত্তরায় জমজম টাওয়ার তৈরি করেন মনির।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অনেক অসাধু কর্মকর্তাকে দামি উপহার ও অর্থ সুবিধা দিয়ে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিতেন মনির। গত বছর মনিরের একটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে রাজউকের ৭১টি ফাইল জব্দ করা হয়। মনিরের সহযোগী রাজউকের কর্মচারী পারভেজকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় মনির 'পলাতক' ছিলেন। পরে মামলাটি সিআইডি হয়ে দুদকে যায়। যদিও তিনি প্রকাশ্যেই সব কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন, মনিরের অন্য সহযোগীদের ধরার চেষ্টা চলছে। এছাড়া স্বর্ণ চোরাকারবারে তার দীর্ঘ দিনের যেসব সঙ্গী এখন গা-ঢাকা দিয়েছেন তাদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।