পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের একজন সাধারণ কর্মচারী দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি অধিদপ্তরের একজন প্রজেকশনিস্ট। নাম আক্তারুজ্জামান খান। তার দায়িত্ব ছিল ভ্যানে করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন কর্মসূচি জনগণকে প্রদর্শন করা। ১৭ গ্রেডের বেতন স্কেলের এই কর্মচারী এখন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

দুদক সূত্র জানায়, আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুদকে পেশ করা একটি অভিযোগের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর মিরপুরে তার নামে সাততলা একটি বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে আরও অনেক সম্পদ আছে। দুর্নীতির অভিযোগে আক্তারুজ্জামান খানকে গত ২৮ অক্টোবর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে আক্তারুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, 'এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় তিনিই আমার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ দাখিল করিয়েছেন।' তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির একটি অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আক্তারুজ্জামান অবৈধ পথে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কর্মসূচি প্রদর্শনের কাজ বাদ দিয়ে অফিসে নথি ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে দুর্নীতিতে হাত পাকিয়েছেন। তার নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের প্রমাণ এখন দুদকের হাতে।

দুদকের অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, আক্তারুজ্জামান খানের নামে রাজধানীর মিরপুরের ৩নং ওয়ার্ডের ১০নং সেকশনের ডি-ব্লকের ২৭নং রোডের ৩নং প্লটে সাত তলা বাড়ি রয়েছে। সাড়ে তিন কাঠা জমিতে নির্মিত বাড়িটির মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। মিরপুরের ৩নং ওয়ার্ডের ১০নং সেকশনে ডি-ব্লকের ৩৩নং রোডের ২০নং প্লটে দেড় কাঠা জমিতে একটি টিনশেড আধাপাকা বাড়ি রয়েছে। জমিসহ এ বাড়িটির মূল্য ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা। মিরপুরের ৩নং ওয়ার্ডের ১০নং সেকশনে ডি-ব্লকে ছয় তলা বিশিষ্ট ১১নং বাড়ির ছয় তলায় প্রায় ১৩ লাখ টাকায় ১ হাজার ২৮০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন।

অনুসন্ধান থেকে আরও জানা যায়, ঢাকা মহানগরের কুড়িল বিশ্বরোডের বারিধারায় সুবাস্তু টাওয়ারে প্রায় ছয় লাখ টাকায় একটি দোকান ক্রয় করেছেন। এটিতে আক্তারুজ্জামানের ছেলে আসিফ খানের মোবাইল ফোনের দোকান রয়েছে। টঙ্গী বোর্ডবাজার এলাকার গাছা ইউনিয়নের সোনাতলায় চার কাঠা জমি ক্রয় করেছেন। যার বাজার মূল্য ৫০ লাখ টাকা। শ্যালিকার নামে ক্রয় করেছেন ঢাকা মেট্রো গ-২৭-৩৯৬৯ নম্বরের দামি গাড়ি। গাড়িটি তিনি নিজে ও পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন। স্ত্রী রোকসানা আক্তার ও ছেলে আসিফ খানের নামে রয়েছে মোটা অঙ্কের টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র।

সূত্র জানায়, আক্তারুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলে জমি ও পাকা বাড়ি আছে। চাকরি জীবনের এক পর্যায়ে তিনি জমিগুলো ক্রয় করেছেন। চাকরি জীবনে তিনি বেতন-ভাতা বাবদ বৈধভাবে ৪২ লাখ টাকা অর্জন করেছেন। তার নামের সম্পদগুলো বৈধ আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

দুদক সূত্র জানায়, আক্তারুজ্জামানের স্ত্রী রোকসানা আক্তার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেন। স্বামীর দুর্নীতিতে তার হাত রয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, আক্তারুজ্জামান পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) নেতা। চাকরিকালে তিনি তদবির, দালালি, ধান্ধাবাজি করেছেন।

দুদকে পেশ করা অভিযোগে আরও বলা হয়, আক্তারুজ্জামান একজন সাধারণ কর্মচারী হলেও চলেন দুর্দান্ত প্রতাপে। ওই ইউনিটের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী তার কাছে জিম্মি। তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বললেই হয়রানির শিকার হতে হয়।

আক্তারুজ্জামানের বাবা নান্দাইলে রাস্তার পাশে ছোট্ট টংঘরে চায়ের দোকান করেন। ১৯৯০ সালে এসএসসি পাস করার পর তিনি বাবার সঙ্গে দোকান করতেন। ১৯৯৩ সালে তিনি ঢাকায় এসে নিকটাত্মীয়ের বাসায় থেকে গার্মেন্টে চাকরি নেন। পরে এক আত্মীয়ের তদবিরে ১৯৯৪ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিটে প্রজেকশনিস্টের চাকরি পান। সর্বসাকুল্যে বেতন ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে বেতন পাচ্ছিলেন ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। চাকরি নিয়ে তিনি ঢাকা ও আশপাশে জনবহুল এলাকায় ভ্যানে পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত ছোট সিনেমা প্রদর্শন করতেন।

জানা যায়, ২০০১ সালে সিনেমা দেখানোর পাশাপাশি অফিসের নথিপত্রের কাজ শুরু করেন। এরপর থেকেই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। প্রবেশ করেন দুর্নীতির জগতে। ২০০৯ সালে আইইএম ইউনিটের একজন পরিচালকের ছত্রছায়ায় এই ইউনিটের সরকারি বাজেট, বিদেশি দাতাদের বাজেট সংক্রান্ত টেন্ডার ওপি, জিওবি, আরএফপি, জাইকা, ইউএনএফপি, ইউনিসেফ, বিকেএমআই, ইউএসআইডি, ডব্লিউএইচওসহ বিভিন্ন সংস্থার ২৩০ কোটি টাকার কাজের নথিগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এর পর ইউনিটের ওই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ লুটে নেন। টানা ২২ বছর তিনি ওইসব কাজের ফাইল দেখাশোনা করেছেন। কাজ না করে ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ করার বিষয়ে তার হাত ছিল পাকা। গত ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আক্তারুজ্জামান বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যান।

জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহিদুর রহমান মিরপুরের বাড়িটি পরিমাপ ও মূল্য নির্ধারণের জন্য গণপূর্তের একজন প্রকৌশলীসহ ঘটনাস্থলে গেলে এ নিয়ে বেশ হইচই পড়ে যায়। অভিযোগটির অনুসন্ধান কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছেন উপপরিচালক মো. সামছুল আলম।