গোটা বিশ্ব এখন করোনা প্রতিরোধী টিকার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রাণঘাতী করোনা সংক্রমণের পর চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে এ টিকা তৈরির কাজ শুরু হয় বিভিন্ন দেশে। কয়েকটি টিকার সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ইঙ্গিতও মিলেছে। তবে এখন পর্যন্ত একটিও ব্যবহারের অনুমোদন পায়নি। তবুও ধনী দেশগুলো টিকা পেতে আগাম অর্থ বরাদ্দ দিয়ে রাখছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও টিকা পেতে দৌড়ঝাঁপ করছে।

টিকা আবিস্কারের দৌড়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আছে। সেগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ডের সহায়তায় অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি টিকা পেতেই বেশি আগ্রহী বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরাও ধারণা করছেন, অক্সফোর্ডের টিকা হবে সহজলভ্য এবং মূল্যও থাকবে সহনীয় পর্যায়ে। একই সঙ্গে এই টিকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও তেমন ঝামেলা নেই। এসব বিবেচনায় অক্সফোর্ডের টিকাই আশার আলো দেখিয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে টিকা আসা শুরু হবে। তবে এ টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দুটি ডোজ প্রয়োগের পদ্ধতিতে ভুল হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর ফলে শিগগিরই অক্সফোর্ডের টিকা অনুমোদন পাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের টিকা পাওয়া নিয়ে নতুন করে সংশয়ের সৃষ্টি হলো।

তবে সরকার অন্য কোম্পানির টিকা পাওয়ার জন্যও চেষ্টা করবে। কিন্তু সমস্যা হলো সেগুলোর দাম বেশি, সংরক্ষণও দুরূহ। ফলে করোনার টিকা প্রাপ্তি নিয়ে এক ধরনের দোলাচলের সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, অক্সফোর্ডের টিকার পাশাপাশি চীনের সিনোভ্যাক, রাশিয়ার স্পুটনিক, সানোফি ও ফাইজারের মতো টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এসব টিকার মধ্যে যেটি আগে পাব, সেটি যেন শুরু করতে পারি সেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই সরাসরি বিষয়টি নজরদারি করছেন। তা ছাড়া টিকা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ হচ্ছে। সুতরাং যে টিকাই আসবে, আমরা তা পাব।

যে কারণে অক্সফোর্ডের টিকায় আগ্রহ: যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন ও নোভাভ্যাক্স, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের টিকা এখন পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে। তবে সংরক্ষণের বিষয়টি দুরূহ হওয়ায় মডার্না ও ফাইজারের টিকা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ মডার্নার টিকা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এবং ফাইজারের টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। এই তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ করা বিশ্বের অনেক দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে আশা জাগিয়েছিল অক্সফোর্ডের টিকা। কারণ উচ্চ তাপমাত্রায়ও অক্সফোর্ডের টিকার কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু এই টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দুটি ডোজ প্রয়োগের পদ্ধতিতে ভুল হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সোমবার অক্সফোর্ডের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার এক ঘোষণায় বলা হয়, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে চূড়ান্ত পর্যায়ের ট্রায়ালে ৬২ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সফলতার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ স্বেচ্ছাসেবককে দুটি পূর্ণাঙ্গ ডোজ দেওয়া হয়েছিল। আর কমসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবককে ভুল করে দেড় ডোজ দেওয়া হয়েছিল। ভুল করে দেড় ডোজ দেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ৯০ শতাংশ সফলতা পাওয়া যায়। এর পরই ওই টিকা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন ওঠে। বলা হচ্ছে, দুটি পূর্ণাঙ্গ ডোজ প্রয়োগের পর সফলতা যেখানে ৬২ শতাংশ, সেখানে দেড় ডোজ দেওয়ার পর ৯০ শতাংশ সাফল্য কীভাবে আসে? ভুল করে যাদের অর্ধেক ডোজ দেওয়া হয়েছিল, তা কেন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ ডোজের তুলনায় বাড়িয়ে দেয়?

সংশ্নিষ্ট গবেষকরা এখন অক্সফোর্ডের টিকার চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষার সম্পূর্ণ তথ্যের জন্য অপেক্ষা করছেন। বিভ্রান্তি এড়াতে অ্যাস্ট্রাজেনেকাও নতুন করে পরীক্ষার চিন্তাভাবনা করছে। তবে এ টিকা তৈরির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট দাবি করেছে, অক্সডোর্ডের টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। এ টিকা নূ্যনতম ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কার্যকর। নানা বয়সের মানুষের মধ্যে পরীক্ষা করে সংস্থাটি নিশ্চিত হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৫ নভেম্বর এ দেশের ওষুধ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মা করোনা প্রতিরোধী অক্সফোর্ডের টিকা বাংলাদেশে সরবরাহ করতে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করে। এ চুক্তির আলোকে তিন কোটি ডোজ পাবে বাংলাদেশ। সরবরাহ ব্যয়সহ প্রতি ডোজের দাম পড়বে ৫ ডলার। এ জন্য অর্থ বিভাগ প্রায় ৭৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এর বাইরে দ্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) থেকে ছয় কোটি ৮০ লাখসহ মোট নয় কোটি ৮০ লাখ করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিন পাবে বাংলাদেশ। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এসব টিকার মূল্য পাঁচশ টাকার মধ্যে থাকবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে টিকা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। ওই বৈঠকে করোনা টিকা প্রাপ্তির সার্বিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে আগে যে টিকা আসবে, সেটি গ্রহণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চীনের সিনোভ্যাক ও রাশিয়ার টিকার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে বৈঠকে উপস্থিত কেউ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

টিকার জন্য বিকল্প চিন্তা করা প্রয়োজন, মত বিশেষজ্ঞদের: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনা প্রতিরোধী কোনো টিকা এখনও আবিস্কার হয়নি। কয়েকটি টিকা ট্রায়ালের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সুতরাং কোনো একটি বিশেষ টিকার প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে সম্ভাব্য অন্যান্য টিকার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অক্সফোর্ডের টিকা কোনো কারণে পেতে বিলম্ব হলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প হাতে রাখা প্রয়োজন। মডার্না কিংবা ফাইজারের টিকা গ্রহণের সামর্থ্য আমাদের নেই। কারণ এ টিকা সংরক্ষণের জন্য যে তাপমাত্রা প্রয়োজন, সে ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্য বিভাগের নেই। আবার এ টিকার দামও অনেক বেশি, যা আমাদের মতো দেশের পক্ষে বহন করার সামর্থ্য নেই। সুতরাং আমাদের চীন ও রাশিয়ার তৈরি টিকার দিকে নজর দিতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অক্সফোর্ডের পাশাপাশি রাশিয়ার তৈরি টিকা পেতে চুক্তি করেছে। সুতরাং বাংলাদেশও সেটি করতে পারে। সব মিলিয়ে টিকা পাওয়ার জন্য বিকল্প হাতে রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, গুণগত মান, কার্যকারিতা এবং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়- এর ভিত্তিতে যে কোনো টিকার অনুমোদন দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যেহেতু এখন পর্যন্ত কোনো টিকাই চূড়ান্ত হয়নি; তাই কোনোটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। কারণ ওই টিকা কার্যকর না হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পাওয়া যাবে না। সুতরাং সম্ভাব্য টিকা উৎপাদনকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন, যাতে কোনো একটি টিকা সফল হলে তা পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি টিকা নিয়ে কাজ করছে। যে টিকা আগে পাওয়া যাবে, আমরা সেটিই গ্রহণ করব। টিকা পাওয়ার বিষয় নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে গ্যাভি এবং কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (সিইপিআই) যৌথভাবে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস বা কোভ্যাক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখান থেকে ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। প্রতিজনকে দুই ডোজ হিসাবে তিন কোটি ৪০ লাখ মানুষকে এ টিকা দেওয়া যাবে। সরকার শুধু অক্সফোর্ডের টিকার ওপর নির্ভর করছে না বলে জানান তিনি।

অক্সফোর্ডের টিকার মান নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও সংশয়: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার কভিড টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সংশয় প্রকাশ করেছে। এমনকি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞও একই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

অক্সফোর্ডের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, এই টিকাই আন্তর্জাতিক টিকা জোটের মাধ্যমে কম দামে দরিদ্র দেশগুলোতে বিতরণের কথা। অক্সফোর্ডের টিকার গড় কার্যকারিতা ৭০ শতাংশ। বিপরীতে মডার্না ও ফাইজারের টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তবে এ দুটি কোম্পানির টিকা সংরক্ষণ জটিল এবং দামও বেশি। ফলে অক্সফোর্ডের টিকা নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপক স্যার জন বেল বলেছেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে টিকার কার্যকারিতা ঘোষণার সমস্যা হলো, এতে সব তথ্য-উপাত্ত থাকে না। এতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করার সুযোগ পান না বাইরের বিশেষজ্ঞরা। তিনি বলেন, করোনার টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকাকে আরও তথ্য সরবরাহ করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক কেট ও'ব্রিয়েনও অধ্যাপক বেলের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিকার সাফল্যের কথা বললে তাতে ঘাটতি থেকেই যায়। টিকা কীভাবে ইমিউন সিস্টেমে সহায়ক হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকা দরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী ডা. সৌম্য সোয়ামিনাথান বলেছেন, এত কম লোকের ওপর অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার পরীক্ষা করা হয়েছে, তা নিয়ে উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন। এ টিকার আরও পরীক্ষা দরকার বলে তিনি মত দেন। তবে যুক্তরাজ্যের গৃহায়নমন্ত্রী রবার্ট জেনরিক বলেছেন, অক্সফোর্ডের টিকা নিয়ে কারও দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। তারা টিকা সম্পর্কিত যে তথ্য দিয়েছে, তা স্বাধীন নিয়ন্ত্রকরা পর্যালোচনা করে দেখবেন।

এদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টিকার অগ্রগতি সরেজমিন দেখতে গতকাল শনিবার দেশটির তিনটি শহর পরিদর্শন করেছেন। তিনি প্রথমে আহমেদাবাদের জাইডাস ক্যাডিলার গবেষণাগারে যান। সেখান থেকে হায়দরাবাদের জিনোম ভ্যালিতে 'ভারত বায়োটেক'-এর গবেষণাগার এবং পরে যান পুনের সিরাম ইনস্টিটিউটে।

ভারত বায়োটেক সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে কভিড টিকা 'কোভ্যাক্সিন' বানাচ্ছে। জাইডাস ক্যাডিলাও কভিড টিকা তৈরি করছে। অন্যদিকে, অক্সফোর্ডের উদ্ভাবিত অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ভারতে তৈরির অনুমতি পেয়েছে সিরাম ইনস্টিটিউট।