জনিক নকরেকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, 'সাংসারেকরা খ্রিষ্টান হলো কেন?' আমরা যাদের গারো বলে জানি, তারা নিজেদের মান্দি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। এই মান্দিদের আদি ধর্মটার নাম সাংসারেক। মান্দিদের প্রায় সবাই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেলেও ১১৬ বছর বয়সী জনিক নকরেক সাংসারেক ধর্ম ছাড়েননি। তার কাছে বিশ্বাস ছেড়ে বেঁচে থাকা কঠিন। গারোদের আদি এই ধর্মের রীতিনীতি পুরোপুরি মেনে চলেন তিনি। জনিক আচ্চু রসিকতা করে বললেন, 'মনে হয় খ্রিষ্টানদের রবিবার আছে বলে।' জনিক নকরেককে আমরা আচ্চু বলে ডাকি। মান্দিদের আচিক ভাষার আচ্চু শব্দটির বাংলা হবে দাদা অথবা নানা। আচ্চু জনিকের কথার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপটা বুঝে নিতে হয়। আচ্চুর বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামে। এটি সেই চুনিয়া গ্রাম, যে গ্রামকে নিয়ে রফিক আজাদ লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা 'চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া'।
চুনিয়ায় আমি যাই অনেকদিন হলো। আচ্চু জনিকের ভাষার গূঢ় অর্থ বুঝতে পারি খানিকটা। তাই 'খ্রিষ্টানদের রবিবার আছে বলে' কথাটাকে আমি নিয়মবদ্ধতা হিসেবে বুঝে নিয়েছি। সত্যিই কি আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে মান্দিদের খুব নিয়মবদ্ধ হওয়ার দরকার ছিল? সেই প্রয়োজনে কি ধর্মান্তরিত হওয়ারও দরকার ছিল সাংসারেকদের? অনেকেই বলেছেন, ধর্ম বদলের সঙ্গে সঙ্গে মান্দিদের বিদ্যায়তনিক শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। ধর্মান্তরিত না হলে কি বাড়ত না? আমার সংশয় রয়েছে এবং বাড়ত বলেই মনে করি।
একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো সম্ভবত ন্যায়-অন্যায়ের ধারণায় বিশ্বাস করে এবং তাই প্রলোভন-প্ররোচনা দিয়ে হলেও অন্যকে ডেকে আনার চেষ্টা করে। একেশ্বরবাদীরা নিজেদের কাছে ঠিক বলে গৃহীত রাস্তার বাইরে অন্য সবকিছুকে ভুল এবং পরিত্যাজ্য বলে ভাবে। তাই অনুসারীদের জীবন এক্ষেত্রে বেশ সাদাসিধে হয়ে ওঠে। বহু ঈশ্বরবাদী ধার্মিকদের কৃত্য এবং অনুষ্ঠানাদি তুলনামূলকভাবে বর্ণাঢ্য। বহু ঈশ্বরের অনুসারী মান্দিদের আদি ধর্মানুসারী সাংসারেকদের প্রধান দেবতা তাতারা রাবুগা। সুসিমি, সালজং, চুরাবুদি, বাগবা বুরুম্বি বা রাক্কাশির মতো আরও অনেক দেবদেবী আছে। প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে জড়ানো বর্ণাঢ্য জীবন মান্দিদের। তাদের ধর্মবিশ্বাস তাদের জীবনের অনুষঙ্গ। জড়বাদ বা আত্মিকতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। অবশ্য এই বাক্য নিয়ে তর্ক চলতে পারে। বরং জীবন, খাদ্য, জরা, আতিথেয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত মান্দিদের ধর্মবিশ্বাস। এসব বিষয়ে নানা দেবতার কাছে নানা বিষয়ে সাহায্য চেয়েছে তারা। ফসল পাওয়ার জন্য পশ্চিম, বন্যপ্রাণী থেকে রক্ষা পেতে চুরাবুদির পূজা করেছে।
গারো পাহাড়ের ধার ঘেঁষে আচিক মান্দিরা বাস করছে চার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে। পাহাড়ের জীবন কঠিন হলেও নিচু পাহাড়ে বাস করা এই মানুষেরা জীবনের আনন্দ উপাচারে ভরপুর যাপন করেছে। 'সরল' এবং 'প্রচুর' শব্দগুলো মান্দি জীবনের সঙ্গে খুব মিলে যায়। তারা যখন নিমন্ত্রণ করে, তখন একেবারে সকলকেই করে। প্রাণ-প্রাচুর্যের এই জীবন থেকে তারা পুরোপুরি সরে যায়নি। তবুও প্রায় সবাই ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণ কী? ধর্ম আর জীবন তো এক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বিষয় নয় একেবারেই। ধর্ম বদলে জীবনকেও তো বদলাতে হয়েছে। সাত দিনের উৎসব ছেড়ে প্রতিদিনের কামলা জীবন মেনে নিতে হয়েছে। 'সব ভালো'র ধারণা থেকে ভালো-মন্দের চর্চায় আসতে হয়েছে। কেন বদলে গেল মান্দিরা?
জাতি হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতে মান্দিরা ভালোভাবেই টিকে আছে। বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা দুই লাখের মতো। ভারতে তাদের রাজ্য আছে। সেখানে ধর্মান্তরও হয়েছে কিছুটা কম। তারা টিকে আছে, তবে বেশ বড় মূল্য দিতে হয়েছে বোধ হয়। ভালো রকম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে- এমন নয়। বরং তাদের ভীষণ রকমের গোষ্ঠীপ্রীতি, বংশপ্রীতি, একতাবদ্ধতা এবং মিলিয়ে চলার চেষ্টা এই পরিবর্তনের দিনেও তাদের টিকিয়ে রেখেছে বলা ভালো। উনিশ শতকের প্রথম দিকে ইউরোপিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান ও আমেরিকানদের মাধ্যমে মান্দিরা খ্রিষ্টানিটির সঙ্গে পরিচিত হয়। তবে উনিশ শতকের প্রথম দিকে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মান্দি খ্রিষ্টান হয়েছিল। বাকিরা সাংসারেক ধর্মেই সুস্থিত ছিল। বিশ শতকের প্রথম অর্ধেকের মধ্যে আশি শতাংশ সাংসারেক মান্দি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নেয়। এর মধ্যে ব্যাপ্টিস্ট, ক্যাথলিক সবাই আছে। ব্যাপ্টিস্টরা সাংসারেকদের আদি রীতিনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। ক্যাথলিকরা আদি সাংসারেক রীতির সঙ্গে সহাবস্থানের রীতিতে খানিকটা মানিয়ে নিয়েছে।
প্রথম যে ব্যক্তিটি ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, তিনি চাকরিতে সুবিধা পেতেই তেমনটা করেছিলেন- এটা অনুমান করা যেতে পারে। কারণ, তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাজ করতেন। তিনি খ্রিষ্টান হওয়ার আগেই 'মোমিন' হয়ে গিয়েছিলেন। মোমিন মান্দির জন্য ধর্মান্তরিত হওয়া সহজ। কারণ, তিনি আগেই সমাজের নিয়ম ভাঙার কারণে সমাজে আর খুব বেশি গ্রহণযোগ্য থাকেন না। মোমিন হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। মান্দিদের প্রধান দুটো মাহারি বা গোত্র হলো সাংমা আর মারাক। মান্দি রীতি অনুযায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক করতে হয় বিপরীত মাহারিতে। না হলে বংশপরিচয় স্পষ্ট থাকে না। বংশপরিচয় স্পষ্ট থাকা দরকার আত্মীয়তা রক্ষা, সম্পত্তি রক্ষা ছাড়াও নানান প্রয়োজনে। যে কোনো একটি নিয়ম ভাঙা মানেই তো কাঠামোকে কিছুটা দুর্বল করা। যারা কোনো কারণে স্বগোত্রে বিয়ে করেন, তারাই মান্দি সমাজে মোমিন বলে পরিচিত হন। এ অবস্থায় ধর্মান্তরিত হওয়াটা বরং ওই মোমিনের জন্য পরিত্রাণের। কারণ তিনি তো আগেই সমাজ থেকে পরিত্যক্ত হয়েছেন। তারপর অন্য মান্দিরা সাংসারেক ধর্ম ছেড়ে খ্রিষ্টান হলো কেন? একজন-দু'জন নয়, অনেক সংখ্যায় ধর্মান্তরের কারণটা কী? এখন প্রায় সকলেই? মিশনারিরা ধর্ম প্রচার করছিল, এটা সবাই জানি। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে সাংসারেকরা, শুধু সাংসারেকরা নয়, প্রকৃতিবাদী ধর্মগুলোর কোনোটাই নিজেদের মতো প্রচারে কখনোই আগ্রহী ছিল না। ধর্ম প্রচার করতে দেখা যায় একেশ্বরবাদীদের। ধর্মান্তরে বিজ্ঞাপন এবং প্রণোদনা অবশ্যই কিছুটা ভূমিকা রাখে। মান্দি অনেকেই নতুন প্রচারিত খ্রিষ্টধর্মে 'পছন্দের ভিন্নতা'র নিয়মেই হয়তো যুক্ত হচ্ছিল। কারও জন্য নিয়ম ভেঙে বিয়ে করে আশ্রয় নেওয়ারও দরকার ছিল। কেউ আবার আধুনিক শিক্ষা এবং চিকিৎসা সুবিধা পেয়ে আনন্দিত ছিল। তা ছাড়া, আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য যে সাংস্কৃতিক বদল, সেটার জন্য একেশ্বরবাদী ধর্ম অবশ্যই বহু ঈশ্বরবাদী ধর্ম থেকে অধিকতর সুবিধাজনক। তাই রুচির এই বদল ঘটছিল।
আধুনিক হয়ে যাওয়া বাবা-মায়েরা সন্তান জন্মের পর তাদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দিয়েছেন দায়িত্ব নিয়ে। পাদ্রিরা এ ব্যাপারে অবশ্যই তৎপর ছিলেন। মিশনারি স্কুল, কলেজ, বিশ্রামাগার, হাসপাতাল সবখানেই সুবিধা পাওয়া গেল। কাউকে কাউকে ভালোবেসে মিশনারি সংগঠনগুলো ঘরটর বানিয়ে দিল। রাষ্ট্র যেখানে বন দখল করছিল, যেটা তাদের জীবিকার উৎস, রাষ্ট্রের অমনোযোগ এবং আগ্রাসনের পাশেই ছিল মিশনারি সংগঠনগুলোর ভালোবাসা। মান্দিদের জমিতে বাঙালির বসতি বাড়ছে, বন হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের সম্পত্তি। টিকে থাকার জন্য নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়া, স্কুলে যাওয়া এবং বিকল্প সংগঠিত বন্ধুর হাত ধরার চেয়ে ভালো বিকল্প ছিল না। রাষ্ট্রের প্রান্তিক নাগরিক হওয়ার চেয়ে, উপজাতি হওয়ার চেয়ে ধর্ম বদলে আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত একটি শক্তির অংশ হিসেবে গর্বিত হওয়াটা হয়তো যৌক্তিক মনে হয়েছিল সমঝোতায় অভ্যস্ত মানবজাতির এই দলটির কাছে, অনিবার্য কারণেই বহুত্ববাদী সাংসারেক বিশ্বাসে বিপর্যয় ঘটেছে।

বিষয় : বন-পাহাড়ের দেশে

মন্তব্য করুন