প্রতিবন্ধীরা কারও দয়া চায় না, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। দক্ষতা অর্জন করে স্বনির্ভর হতে চায়। ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার সমকাল, ডেইলি স্টার ও প্রেরণা ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ' শীর্ষক বিশেষ সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। ভার্চুয়াল এই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। এ সময় প্রেরণা ফাউন্ডেশনের 'অগ্রগতির অনুপ্রেরণা' নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন করা হয়।

বক্তারা বলেন, ভালোবাসা, বিশেষ যত্ন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারলে প্রতিবন্ধীরাও দেশের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে। এরই মধ্যে তারা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। এ মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

বাড়ানো দরকার সচেতনতা।

স্বাগত বক্তব্যে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, 'আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা প্রতিবন্ধীদের মাঝে পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য প্রথমেই মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের চাইতেও দক্ষ। সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের মর্যাদাবোধ বাড়াতে হবে। আমরা যদি তাদের চাকরি না দিই, বিভিন্ন কাজে যদি তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ না দিই, তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারবেন না। বিশেষ করে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা দিতে হবে। তারা যেভাবে পৃথিবীকে দেখে আমরা সেভাবে দেখতে পারি না। সামাজিক মূল কর্মকাণ্ডে তাদের নিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে ডেইলি স্টার ও সমকাল কাজ করবে।'

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, 'প্রতিবন্ধীদের অনেক কাজ বাংলাদেশে হচ্ছে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় সমন্বয়হীনতার কারণে এর সুফল প্রতিবন্ধীদের ঘরে উঠছে না।'

তিনি বলেন, 'আমরা মনে করি, শুধু পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমাদের দায় শেষ হয় না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ চাই। আশা করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধীবান্ধব একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারব। প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে আরও সুন্দর পরিবেশ দরকার। শুধু দান-দাক্ষিণ্যই নয়, তারা যেন তাদের অধিকার নিয়েই বাঁচতে পারে। প্রতিবন্ধীবান্ধব সরকার ক্ষমতায় আছে। সবাই মিলে কাজ করলে প্রতিবন্ধীরা এগিয়ে যাবেন।'

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে অন্য নাগরিকদের সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও সমসুযোগ ও অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচি প্রবর্তন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিবন্ধীদের অধিকারের বিষয়টি দেখা। বঙ্গবন্ধু এটি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এটি সহমর্মিতা দিয়ে অনুভব করেন। সায়মা ওয়াজেদ হোসেন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন। এ রকম মানুষদের শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের নজরে এনেছেন তিনি।

জুয়েনা আজিজ বলেন, এসডিজির মূল বিষয় কাউকে পেছনে ফেলে অগ্রগতি নয়। এসডিজিতে প্রতিবন্ধীদের মূল স্রোতধারায় আনার বিষয়টি আছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়ও আছে। নগরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষরা কীভাবে চলবে, সে বিষয়টিও আছে। আছে অংশীদারিত্বের বিষয়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মন্ত্রণালয়গুলোর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের কথা মাথায় রাখা হচ্ছে। হতাশার কিছু নেই। সরকার তৎপর।

প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা আছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবন্ধীদের জন্য ডাটাবেজ করা হয়েছে। সেখানে ১৯ লাখেরও বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য আছে। যখনই একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নজরে আসছে তার বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সেখানে কার কী পেশা, সব দেওয়া আছে। কোন ধরনের প্রতিবন্ধী, তা ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই তথ্যভান্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অটিজম সেলের প্রধান সমন্বয়ক ডা. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে ১২ রকম প্রতিবন্ধিতার কথা আছে। আমরা পাঁচ ধরনের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে মূলত কাজ করি। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে জাতীয় কমিটি আছে। জাতীয় কমিটির আলোকে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কমিটি আছে। অনেক সময় আমরা বিভিন্ন উপজেলায় গিয়েও সভা করি।

তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীদের মধ্যে একমুখী প্রতিভা আমরা দেখেছি। যে ছবি আঁকে, সে খুব সুন্দরভাবে ছবি আঁকে। এ পর্যন্ত সাত হাজার ৪০০ শিশুকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি। যাদের গুরুতর সমস্যা আছে, তাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন স্কুলে ভর্তি করানো হয়।

প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, কাজে কোনো ঘাটতি নেই। তৃণমূল পর্যায়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ফলে আমরা এখন উপজেলা পর্যায়ে মিটিং করছি। প্রতিবন্ধীদের মূল স্রোতধারায় আনতে আমরা কাজ করছি।

বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো বলেন, বাংলাদেশে সরকারের পাশাপাশি আইএলও, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএসহ বেসরকারি অনেক সংস্থা কাজ করছে। প্রতিবন্ধীদের মূল স্রোতধারায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সচেতনতা তৈরিতে মিডিয়া বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের প্রতি জোর দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীদের মূল জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না। তাদের মূল স্রোতে আনতে হবে। তাদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রতিবন্ধীদের দক্ষতা বাড়লে কর্মসংস্থান হবে। এতে দেশ এগিয়ে যাবে।

এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি পর্যায়ে সমন্বয়ের যে ঘাটতি আছে, তা পূরণ করা দরকার। এটি শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এ দায়িত্বের ভার অন্য মন্ত্রণালয়েরও গ্রহণ করা দরকার। প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দক্ষতা দেখানো হলেও মাঠ পর্যায়ে কিছুটা দুর্বলতা আছে। যুব উন্নয়ন ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০% কোটা দেওয়া আছে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিবছর বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ বাড়ছে। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও চাকরিক্ষেত্রেও আরও সুযোগ তৈরি করতে হবে। এরই মধ্যে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে। প্রতিবন্ধীরা সবাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। সুযোগ পেলে তারা প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে চায়। সে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। পরিবেশ, পাঠক্রম এবং অবকাঠামোর কারণে তারা সুযোগগুলো গ্রহণ করতে পারছে না।

প্রেরণা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুবিনা আসাফ বলেন, তারা সরকারের এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন। সরকার অনেক সুন্দর উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ না থাকলে এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমাদের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মূলধারার স্রোতে আনা। তাদের স্বনির্ভর করতে স্থায়ী পরিকল্পনা নিয়েছি। করোনাকালে প্রতিবন্ধী মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েছে। তাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তাদের দিয়ে মাস্ক তৈরি করিয়েছি। সেগুলো স্বপ্নের শোরুম ও অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে।

মুবিনা আসাফ বলেন, অর্থনৈতিক কাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক পরিকল্পনা নিয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ জায়গায় কাজ করছে। বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য সংস্থাকে জাতিসংঘ সহায়তা দিচ্ছে। আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে ডাটাবেস তৈরি করেছি। সেখানে তাদের সাফল্যের গল্প পাব। যার নাম 'অগ্রগতির অনুপ্রেরণা'। এখানে সব নথিভুক্ত থাকবে। এখান থেকে প্রত্যেকের তথ্য একবারেই নেওয়া যাবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজমের (ইপনা) প্রশিক্ষণ সমন্বয়ক ডা. মাজহারুল মান্নান বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে সরকার অনেক কাজ করছে। বাজেট আছে, মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে। তবে ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যেককে নিজের বিবেক জাগ্রত করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের অধিকারের বিষয় সবাইকে চিন্তা কতে হবে। প্রতিবন্ধীদের অধিকারের বিষয়টি মানুষের চিন্তাধারায় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ জন্য মিডিয়াকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।