মাদারীপুরের শিবচরে জন্ম মো. হারুন-অর-রশীদের। শৈশব কেটেছে উত্তাল পদ্মার ওপারে। মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে চলে আসেন ঢাকায়। পড়াশোনা শেষ করে তিনি এখন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বর্তমানে ঢাকায় প্রথম কোর্ট অব সেটলমেন্টে কর্মরত। জীবনের এতটা বছর পেরিয়ে পদ্মার এপার থেকে ওপারে যেতে স্বপ্নের সেতু এখন তার সামনে। তাইতো গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে রাজধানী থেকে ছুটে আসেন পদ্মাপাড়ে। সন্তানের হাতে লাল-সবুজের পতাকা। তিনজনের পরনেই জাতীয় পতাকার রঙের পোশাক। নদীর কূলে দাঁড়িয়ে এক পলকে তাকিয়ে আছেন জলরাশির বুকে গড়ে ওঠা পদ্মা সেতুর দিকে। এগিয়ে কথা বলতে গেলেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন মো. হারুন-অর-রশীদ। সেই ছোটকাল থেকে পদ্মা নদী ঘিরে কষ্টের কথা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরছে। ঘন কুয়াশায় ফেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা আর দুর্ঘটনার ভীতি তো আছেই। দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া স্বজনকে শেষ দেখতে না পারার বেদনাও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। এক রাশ কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, পদ্মাপাড়ের এই মানুষের কাছে নদী যত না আবেগ, তার চেয়ে বেশি আতঙ্কের। ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে ৮-১০ ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হতো। এই একটি নদীর কারণেই চিকিৎসার অভাবে কত মানুষকে মরতে হয়েছে। অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের সময় তার চেহারায় স্বপ্ন, প্রত্যয় আর সাহসের আভা ছড়িয়ে পড়ল। স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে আগে যেখানে ৮-১০ ঘণ্টা লাগত, পদ্মা সেতুর কারণে সেই পথ পাড়ি দেওয়া যাবে মাত্র এক ঘণ্টায়। এটা কোটি মানুষের জীবন পাল্টে দেবে।

বৃহস্পতিবার পদ্মা সেতুতে শেষ স্প্যানটি বসার পর থেকেই আবেগে ভাসছে দেশের আপামর মানুষ। অনেকেই এখন দিন গুনছেন কবে পদ্মা নদী পাড়ি দেবেন এই স্বপ্নের সেতু দিয়ে।

গতকাল শুক্রবার পদ্মা সেতু দেখতে হারুন-অর-রশীদের মতো হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন নদীর তীরে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের পুরোনো মাওয়া ঘাট ও শিমুলিয়া ঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে শীতের কুয়াশাঘেরা সকাল থেকেই ছিল মানুষের ভিড়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ আসেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। ছুটির দিন হওয়ায় এমনিতেই ভিড় বেশি, তার ওপর একসঙ্গে পদ্মা সেতুর পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখার আকাঙ্ক্ষা তো আছেই। সকালের দিকে কুয়াশার কারণে দূর থেকে পদ্মা সেতু ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। দুপুরের দিকে সূর্যের আলোয় ধূসর রঙের পদ্মা সেতু ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে। তবে নিরাপত্তার কারণে সেনাসদস্যরা প্রকল্প এলাকার ভেতর কাউকে প্রবেশ করতে দেননি। দর্শনার্থীরা দূর থেকেই সেতু দেখেছেন। অনেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়েও সেতুর নিচের আশপাশ ঘুরে দেখেছেন। কেউ কেউ নিরাপত্তা ভেদ করে সেতুর প্রান্তে গিয়ে সেলফি তুলেছেন।

ঢাকার দোহারের নবাবগঞ্জ থেকে বাইসাইকেলে ৯ সদস্যের শিক্ষার্থীর একটি দল ৪৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পদ্মা সেতু দেখতে এসেছেন মাওয়া ঘাটে। নদীর পাড়ে ঘুরে ঘুরে তারা সেতু দেখেছেন, ছবি তুলেছেন। এ দলের কামরুল ইসলাম বলেন, গতকাল আসতে পারিনি, আজ এসেছি ইতিহাসের সাক্ষী হতে। বিজয়ের মাসে এমন বিজয় আমাদের উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত করেছে।

মাওয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কুয়াশার কারণে আগের রাতে ফেরি বন্ধ থাকায় দুপুরেও গাড়ির দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা। গোপালগঞ্জগামী বাসে মোমেনা বেগমের চোখে ক্লান্তির চাপ। তবুও স্বস্তির সুরে তিনি বলেন, পদ্মার ওপর সেতু হবে, এটা কল্পনার বাইরে ছিল। এসব কষ্ট মুছে যাবে স্বপ্নের সেতু চালু হলেই।

পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হলে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও ভোলা থেকে ঢাকায় যেতে সময় কমে যাবে প্রায় দেড় থেকে ২ ঘণ্টা। আর যাত্রীসেবার মানও বাড়বে কয়েকগুণ।

বাসচালক আজিজুর রহমান বলেন, ফরিদপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা পদ্মা নদীর কারণে ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন। এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়ে গেছে গত মার্চে। এবার পদ্মা সেতু চালু হলে সরাসরি বাস চলাচল বাড়বে। এতে সময় অনেক কম লাগবে।

ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আনিসুল হক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে গেছেন পদ্মার পাড়ে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু আমার কাছে অনেক আবেগের। এ সেতু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সক্ষমতার সাক্ষ্য। বিশ্ব মানচিত্রে নিজেকে চেনাবার অনন্য নজির হয়ে থাকবে এই সেতু।

এ দিকে পদ্মা সেতুকে ঘিরে সংলগ্ন এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা। এরই মধ্যে আশপাশ এলাকা বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ বেড়াতে আসছেন। তাদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেতুর অবকাঠামো, স্নিগ্ধ বাতাসের ছোঁয়া আর পদ্মার জলে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ এখন আর কেউ হাতছাড়া করতে চাইবেন না।

পুরোনো মাওয়া ঘাটের ব্যবসায়ী ওহাব মিয়া বলেন, পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করার পর ভেবেছিলাম ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ। এখন দেখা যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। ঘাটের ব্যস্ততা না থাকলেও দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন বিকেলে সাধারণ মানুষ আসেন ঘুরতে।

প্রায় ১০ বছর ধরে পুরোনো মাওয়া ঘাটে হোটেল ব্যবসা করেন আরিফুর রহমান। সেই ঘাটে আগের মতো হাঁকডাক না থাকলেও বিক্রি কমেনি জানিয়ে তিনি বলেন, একটা সময়ে নদী পার হতে পণ্যবাহী গাড়ি নিয়ে চালক আর ব্যাপারীদের কয়েক দিনের অপেক্ষা করতে হতো। এখন আর সেই অবস্থা নেই। তবে তার হোটেলে বিক্রি কমেনি। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের কারণে ব্যবসা ভালোই চলছে। পদ্মা সেতু চালু হলে পর্যটকের ভিড় আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, হোটেলগুলোতে পদ্মার ইলিশের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ঘুরতে আসা লোকজন এখানে বসে ইলিশ ভাজা খেতে পছন্দ করেন।

মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের এমপি ও সাবেক হুইপ অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, পদ্মা সেতু এই অঞ্চলের মানুষের আথর্-সামাজিক অবস্থা বদলে দেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কারণেই সব সম্ভব হয়েছে। মানুষের আবেগ আর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে সেতুটিতে। মানুষের অবদানও মনে রাখার মতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে তারা নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে দিয়েছেন পদ্মা সেতুর জন্য। সেতুটি পুরো দৃশ্যমান হওয়াকে ঘিরে উচ্ছ্বাসটাও বাঁধভাঙা।