দেশের শহরগুলোতে বসবাসকারী পরিবারের ২১ শতাংশ তাদের খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। এসব পরিবারের অনেকে রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যান। অনেকে একবেলা না খেয়ে থাকেন। সামগ্রিকভাবে এসব পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সঙ্গিন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) 'নগর আর্থসামাজিক অবস্থা নিরূপণ' শীর্ষক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সামনে রেখে প্রথমবারের মতো এ জরিপ করেছে সংস্থাটি।
বিবিএস মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে 'কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পারসোনাল ইন্টারভিউ' পদ্ধতিতে এ জরিপ করে। গত বছরের ১৪ থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সকল সিটি করপোরেশনে এ জরিপ করা হয়েছে। সম্প্রতি জরিপের ফলাফল প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করেছে বিবিএস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বর্তমানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
জরিপ-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক পরিবার শহরে এসে ঠাঁই নিচ্ছে। অনেকে নদীভাঙনসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে শহরে আসছেন। অনেকে আসছেন কাজের সন্ধানে। কিন্তু শহরে এসে সবাই কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় থাকছেন। অন্যদিকে শহরে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। বিবিএসের জরিপের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান সমকালকে বলেন, এর আগে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও নগর দারিদ্র্য বিশেষ প্রাধান্য পায়নি। কিন্তু নগর দারিদ্র্য এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিএস করোনাভাইরাস পরিস্থিতির আগে জরিপ করেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে নগর দারিদ্র্যের আরও অবনতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জোরালোভাবে দৃষ্টি দেওয়ার সময় এসেছে। তিনি বলেন, শহরের দরিদ্রদের প্রধান সমস্যা পুষ্টি ও স্বাস্থ্য। তারা ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। আবার এসব পরিবারের শিশুরা শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির উন্নতি করা না গেলে সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
বিবিএস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, জরিপ করার ৩০ দিন আগে থেকে পর্যাপ্ত খাবার না থাকার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশ দুশ্চিন্তায় ছিল। অন্যান্য শহরে এই হার ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। সব মিলিয়ে শহরে বসবাসকারী ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ পরিবার খাবার নিয়ে চিন্তিত ছিল। ওই সময়ে মহানগরে বসবাসকারী ২০ দশমিক ৬৪ শতাংশ পরিবার তাদের পছন্দের খাবার খেতে পারেনি। অপছন্দের খাবার খেয়েছে ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ পরিবার। প্রয়োজনের তুলনায় কম খেয়েছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ পরিবার। একবেলা না খেয়ে থেকেছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ পরিবার। কোনো খাবার ছিল না বা খাবার কেনার টাকা ছিল না ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ পরিবারের। খাবার না থাকায় রাতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে গেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার। পুরোদিন অনাহারে থেকেছে ২ দশমিক ৮০ শতাংশ পরিবার।
প্রতিবেদনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ক্রমাগত নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন বাংলাদেশে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। শহরাঞ্চলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনগণ বস্তিতে বাস করে। জীবনমানের নিম্নস্তরে বসবাস, খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক অভিঘাতে নিমজ্জিত হওয়ার কারণে তারা ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব জনগণের পরিস্থিতি উন্নয়নে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
জরিপে দেখা গেছে, শহরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর পরিবারপ্রধানদের ১৫ শতাংশের পেশা শ্রমমজুরি। ২৫ শতাংশ বেতনভুক্ত কর্মচারী এবং ১৮ শতাংশ স্বনিয়োজিত। ২০ শতাংশ ব্যবসায়ী। আয় হয় না এমন পেশা রয়েছে ১৬ শতাংশ পরিবারপ্রধানের। দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবারের সন্তানরা স্কুলে যাচ্ছে না। ১২ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের ৬৮ শতাংশ স্কুলে যায়। বাকি শিশুদের কেউ কেউ উপার্জনের জন্য কাজ করছে, কেউ কেউ পরিবারের কাজে সহায়তা করছে এবং কেউ কেউ অলস সময় পার করছে। বেশিরভাগ পরিবার সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা বিশেষ পাচ্ছে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেওয়া উপবৃত্তি ৩ শতাংশ পরিবার পেলেও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা এক শতাংশ পরিবারও পায় না। অন্যদিকে শহরের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, খাদ্যদ্রব্যের দ্রুত দাম বাড়ার কারণে তাদের পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। এমন পরিস্থিতিতে খরচ কমানোর জন্য নিম্নমানের খাবার খায় ১৭ শতাংশ পরিবার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীভাঙন, কাজের সন্ধান, নিরাপত্তার জন্য, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য এবং উচ্ছেদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক পরিবার স্থায়ীভাবে শহরে বসত গড়ছে। এসব থেকে ভোলা জেলার লোক শহরমুখী হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ ধরনের সমস্যায় পড়ে যত পরিবার শহরে আসছে তার মধ্যে ভোলা থেকে এসেছে ১৭ শতাংশ পরিবার। বরিশাল থেকে এসেছে ১০ শতাংশের বেশি পরিবার। সিরাজগঞ্জ থেকে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ, ঢাকা জেলা থেকে ৫ শতাংশ, কুমিল্লা থেকে ৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং কিশোরগঞ্জ থেকে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ পরিবার এসেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, চাঁদপুর, বাগেরহাট, বগুড়া, খুলনা, রাজশাহী, সুনামগঞ্জ, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, সিলেট, নোয়াখালী ও যশোর জেলা থেকেও অনেক পরিবার শহরমুখী হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দ্রুত নগরায়ণের কারণে শহরাঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রয়োজন ও চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে অপ্রতুল নগরভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে। এ অবস্থায় নগরাঞ্চলের অভাবী পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করা এখন সময়ের দাবি। শহরাঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র শ্রেণির জীবনমান ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক নিম্নমানের। বস্তির ক্রমবর্ধমান বিবর্তন নগরজীবনে ব্যাপক মেরুকরণ ঘটাচ্ছে, যেখানে চরম ধনী ও চরম দরিদ্র শ্রেণি পাশাপাশি বাস করে। এই মেরুকরণ সকল আর্থসামাজিক সূচকে দ্বৈততার চিত্র উন্মোচন করে।

বিষয় : বিবিএসের জরিপ

মন্তব্য করুন