বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আনা অসাদচারণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়ে এবং এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিশিষ্ট ৪২ জন নাগরিক বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানান। রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া এ সংক্রান্ত চিঠির অভিযোগগুলো সম্পর্কে কমিশনের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়াও কমিশনার রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদত হোসেন চৌধুরী ও আলমগীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তবে আরেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার উপস্থিত ছিলেন না। যিনি নিজে কমিশনের সদস্য হয়েও বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের শুরুতে সিইসি নূরুল হুদা বলেন, সম্প্রতি দেশের ৪২ নাগরিক ভার্চুয়াল সম্মেলনের মাধ্যমে ইসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন বলে তারা (কমিশনার) শুনেছেন। এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ ব্যাপারে কমিশনের বক্তব্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সিইসি বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে প্রশিক্ষণের কর্মপরিকল্পনায় ১৫ জন বিশেষ বক্তার জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দই ছিল না। ফলে, প্রায় ২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নির্বাচনী প্রশিক্ষণের জন্য বক্তৃতা না দিয়ে বিশেষ বক্তা হিসেবে সম্মান গ্রহণ বিষয়ে সিইসি বলেন, ইসির কর্মপরিকল্পনায় ১৫ জন বিশেষ বক্তার সম্মানী বাবদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক কোটি চার লাখ টাকা এবং পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা সংস্থান রাখা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ জন বিশেষ বক্তা প্রশিক্ষণ প্রদান করে সম্মানী গ্রহণ করেছেন।

তিনি বলেন, যেখানে দুই কোটি টাকার বরাদ্দই ছিল না; সেখানে নির্বাচন 'বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দেওয়ার নামে দুই কোটি টাকার মতো আর্থিক অসদাচারণ অনিয়ম' অভিযোগ অসত্য তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। যা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংবিধানের ১৪৭ (৩) অনুচ্ছেদের বিষয়বস্তু প্রশিক্ষণ সম্মানের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। ফলে সংবিধান লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠতে পারে না।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, কমিশন গত তিন বছরে প্রাধিকারভুক্ত গাড়িই পায়নি। যে গাড়ি ব্যবহার করছে, সেটি কমিশন কার্যালয়ে ব্যবহূত হত। কর্মচারী নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এবং ইভিএম ক্রয় ও ব্যবহারে কোনো দুর্নীতি হয়নি বলেও দাবি করেন সিইসি। বিভিন্ন নির্বাচনে অসদাচরণ ও অনিয়ম নিয়ে সিইসি বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশি কূটনীতিকেরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোও কোনো অভিযোগ করেনি। স্থানীয় সংসদ নির্বাচনে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন।

কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্নীতির অভিযোগ খন্ডন করে সিইসি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ছিল নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত। নিয়োগের যাবতীয় প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে সম্পন্ন করে নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। কোন প্রমাণ ছাড়াই চার কোটি ৮ লাখ টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে মর্মে যে অভিযোগ তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন।

ইভিএম ক্রয় ও ব্যবহারে অসদাচরণ ও অনিয়মের অভিযোগের জবাবে নূরুল হুদা বলেন, ইসি নিজে ইভিএম আমদানি করেনি। পিপিআর অনুসরণ করে ক্রয় করা হয়েছে। ইভিএম কেনার কোন বিল কমিশনের কাছে ন্যস্ত হয় না। এ কাজে নির্বাচন কমিশন কোন আর্থিক লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত থাকে না। এখানে দুর্নীতির কোন প্রশ্ন ওঠে না।

জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণ অনিয়মের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকগণ কোনো অভিযোগ তোলেননি। নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করে বক্তব্য তাই গ্রহণযোগ্য নয়। সিইসি দাবি করেন, নির্বাচনে ভোট পড়ছে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ। প্রতি আসনে বা পদে প্রার্থী ২ থেকে ৮ জন। নির্বাচনের প্রতি মানুষ তাই আস্থা হারিয়েছে, একথা ভিত্তিহীন।