প্রাণহানি কমানোসহ দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ও প্রস্তুতিতে যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও এখনও আত্মতুষ্টির সময় আসেনি বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ঘূর্ণিঝড় আম্পানসহ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের দুর্যোগ সাড়াদান কার্যক্রমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, জাতীয় আইন, নীতি-আদেশ কার্যকরে 'ঘাটতি' ছিল বলে মনে করছে সংস্থাটি। বিদ্যমান সুশাসনের ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১২ দফা সুপারিশ করেছে তারা।

২০২০ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারেরর গৃহীত কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে বৃহস্পতিবার 'দুর্যোগ মোকাবেলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়: ঘূর্ণিঝড় আম্পানসহ সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা' শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। সেখানেই এসেছে তাদের এ পর্যবেক্ষণ।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সুনাম অর্জন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো দেশ আমাদের মডেল অনুসরণও করছে। কিন্তু ব্যাপক অগ্রগতি স্বত্ত্বেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, জাতীয় আইন, নীতিমালা এবং আদেশাবলী প্রতিপালনে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। পাশাপাশ বিদ্যমান গবেষণায় সুশাসনের প্রতিটি নির্দেশকেই ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে। যেহেতু বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবেলায় ভালো করেছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সক্ষমতাও আছে, ফলে ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় আরও ভালো করা সম্ভব। আশা করি এই গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল ও সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে।'

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, 'দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘকালীন যে চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বিদ্যমান সেগুলো অবহেলা করা হয় এবং চ্যালেঞ্জসমূহ নিরসন করে অগ্রগতির প্রয়াসে ঘাটতি দেখা যায়। আমরা যদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও উৎকর্ষ সাধন করতে পারি তাহলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জাতীয় আয়ের গড়ে ২.২ শতাংশ বাৎসরিক ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।'

গবেষণায় স্থানীয় জনপ্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতির ফলে দুর্গম এলাকায় যথাসময়ে ত্রাণ না পৌঁছানো, একই সুবিধাভোগীর একাধিকবার ত্রাণ পাওয়াসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ৪টি প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে ১৪০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে প্রতিবেদনে। 

টিআইবি বলেছে, 'প্রকল্প বাজেটের শতকরা হিসেবে এই আর্থিক ক্ষতির হার সর্বনিম্ন ১৪.৩৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৭৬.৯২ শতাংশ পর্যন্ত। এই চারটি প্রকল্প হলো- পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে পোল্ডার নির্মাণ প্রকল্প, মনু নদী সেচ ও পাম্পহাউজ পুনর্বাসন, খুলনার কয়রায় বাঁধ সংস্কার প্রকল্প।

প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন ইউনিটের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নেওয়াজুল মওলা এবং জলবায়ু অর্থায়নে পলিসি ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার কাজী আবু সালেহ। ঘূর্ণিঝড় আম্পানসহ সাম্প্রতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুশাসনের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ পর্যালোচনা করতে গত ১৮ মে থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়নের কাজ করা হয়। 

নেওয়াজুল মওলা প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, 'বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগ সাড়াদান কার্যক্রমে সুশাসনের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে এ গবেষণায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো হলো- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, জাতীয় আইন, নীতি ও আদেশের প্রতিপালনে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি; সতর্কবার্তা প্রচারে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, প্রচার পদ্ধতির আধুনিকায়ন না করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে বিভ্রান্তিকর জরুরি সতর্কবার্তা প্রচারের ফলে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বৃদ্ধি ইত্যাদি। 

এছাড়া দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি, ত্রাণ বিতরণ ও তদারকি সংক্রান্ত তথ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ না করা; ত্রাণ সংক্রান্ত তথ্য ও সুবিধাভোগীর তালিকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে প্রকাশ না করা; ত্রাণ বরাদ্দ, বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে অনিয়ম এবং কার্যকর তদারকি ও অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থার ঘাটতি বিদ্যমান বলে টিআইবি মনে করছে। দুর্যোগ নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক মহড়ার আয়োজন না করা, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো (বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) চিহ্নিত ও মেরামত করা এবং ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির কার্যকরিতায় ঘাটতি দেখতে পেয়েছেন টিআইবির গবেষকরা। 

এছাড়া জনসংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকা, যথাযথভাবে ত্রাণের চাহিদা নিরুপণ ও স্থানীয়ভাবে ত্রাণ মজুদসহ জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় ঘাটতি, জরুরি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশনসহ দুর্গত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে ঘাটতি, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় ১২টি সুপারিশও করেছে টিআইবি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- সতর্কবার্তা দেওয়ার পদ্ধতি হালনাগাদ করা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, এলাকাভিত্তিক পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রমে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয় বন্ধে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা, অনিয়ম-দুর্নীতির স্বচ্ছ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।