জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতিমালার ওপর ভিত্তি করেই এত দিন বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম চলেছে। কোনো আইন না থাকার সুযোগ নিয়ে অনেক এজেন্সি হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করে আসছে। তাদের লাগাম টেনে ধরতে নীতিমালার পরিবর্তে এবার আইন প্রণয়ন করছে সরকার। এ আইনে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে হজ ব্যবস্থাপনা জাতীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এরই মধ্যে অংশীজনদের মতামত নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় আইনটি চূড়ান্ত করেছে। এতে নিবন্ধনে কোনো অনিয়ম ও অসদাচরণ করলে হজ এজেন্সির স্বত্বাধিকারীকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং ওমরাহ হজ এজেন্সির স্বত্বাধিকারীকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত তদন্ত ও শুনানির সুযোগ থাকবে। হজের মতো ওমরাহর জন্যও প্রাক-নিবন্ধন ও নিবন্ধন করতে হবে। বর্তমানে ওমরাহ যাত্রীদের কোনোরকমের নিবন্ধন বা প্রাক-নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ে না।

এসব বিধান রেখে হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২০ চূড়ান্ত করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে আইনটি অনুমোদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি পরে জাতীয় সংসদে পাস হলে বিদ্যমান 'জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি ১৪৪০ হিজরি/২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ' রহিত হবে। আজকের বৈঠকে মহাসড়ক আইন, ২০২০-এর নীতিগত অনুমোদন হতে পারে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, হজ ও ওমরাহ পালনে যেতে হলে নির্ধারিত মেডিকেল বোর্ড দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য বিবেচিত হতে হবে। সরকারকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সরকারের দেওয়া নির্দেশনা ও নির্ধারিত শর্তাদি প্রতিপালন করতে হবে। হজ বা ওমরাহ এজেন্সি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা নিবন্ধন নির্ধারিত করতে পারবে। বিদ্যমান হজ ও ওমরাহ নীতিমালার প্রায় সব বিধিবিধানও আইনে রয়েছে।

নিবন্ধন ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হজ বা ওমরাহ এজেন্সি প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনা করতে পারবে না। সরকার বা সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পবিত্র হজ বা ওমরাহ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হজ এজেন্সি বা ওমরাহ এজেন্সি এ আইনের অধীন নিবন্ধন দেবে। নিবন্ধন আবেদন, নিবন্ধন প্রদান, নবায়ন, বাতিল-সংক্রান্ত পদ্ধতি ও অন্যান্য বিষয় সরকার নির্ধারণ করবে।

পরপর তিন বছর কোনো হজ বা ওমরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হলে তারা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। কোনো হজ বা ওমরাহ এজন্সিকে অনিয়মের জন্য পরপর দুইবার তিরস্কার করা হলে ওই এজেন্সির কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্থগিত হয়ে যাবে। নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর কোনো হজ এজেন্সির স্বত্বাধিকারী ও অংশীদার পরবর্তীকালে নিবন্ধন পাওয়ার অধিকারী হবেন না বা অন্য কোনো এজেন্সির কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বা সম্পৃক্ত হতে পারবেন না।

নিবন্ধন বা নবায়নের মেয়াদ শেষ হওয়ার নূ্যনতম ৩০ দিন আগে হজ বা ওমরাহ এজেন্সিকে নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর তদন্ত করে তা যথাযথ বিবেচিত হলে নিবন্ধন নবায়ন করতে পারবে। কোনো হজ বা ওমরাহ এজেন্সি তার নিবন্ধন সনদ অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া হস্তান্তর কিংবা ব্যবসায়িক ঠিকানা পরিবর্তন করতে পারবে না।

কোনো হজ বা ওমরাহ এজন্সির বিরুদ্ধে এক বা একাধিক অনিয়ম বা অসদাচরণের জন্য প্রশানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। যেমন হজ বা ওমরাহ যাত্রীকে হয়রানি, ভোগান্তি বা আর্থিক ক্ষতি সাধন করলে, অসত্য তথ্য বা প্রতারণার মাধ্যমে নিবন্ধন সনদ গ্রহণ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে বা নিবন্ধন সনদ পাওয়ার পর ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে বিদ্যমান হজ ও ওমরাহ নীতি রহিত হবে।

হজ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি: হজ ব্যবস্থাপনা পরিবীক্ষণ, সার্বিক পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাপতি করে একটি জাতীয় কমিটি থাকবে। কমিটির অন্য সদস্য থাকবেন- ধর্ম মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, ধর্ম সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, সুরক্ষা সচিব, জননিরাপত্তা সচিব, অর্থ সচিব, তথ্য সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব, ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচলকসহ ২৩ সদস্য। এ ছাড়া হজ ব্যবস্থাপনায় একটি নির্বাহী কমিটি থাকবে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীকে সভাপতি করে ২৫ সদস্যের কমিটি থাকবে।

কমিটি প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও নির্দেশনা প্রদান এবং হজ প্যাকেজ অনুমোদন করবে। কমিটির সদস্যরা বছরে অন্তত একবার বৈঠকে বসবে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনাকে নির্বিঘ্ন ও সুষ্ঠু করতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন করার উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১২ সালে হজ আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়। ২০১৩ সালে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে তা অধিকতর সংশোধন করে পরবর্তী যে কোনো সময় মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এটি মন্ত্রিসভায় উঠছে।