আমার কাছে মনে হয়, দুটি ঘটনাই উল্লেখযোগ্য। একটি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের বিজয় আজকের কংগ্রেস থেকে অনুমোদনের ফলে তিনি তার নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। সাংবিধানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া, তা চূড়ান্ত পরিণতি পেল। এখন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে তার আর কোনো অসুবিধা রইল না। কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার সফল পরিণতি ঘটল। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই পরিণতি এলো, সেই ঘটনা; যা অভাবনীয়, দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় অভ্যন্তরীণ একটি দিক আছে, বাইরের পৃথিবীর জন্য আছে আরেকটা দিক। এ ক্ষেত্রে প্রথম বিষয়টি হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর প্রসঙ্গে বলা যায়, বাইরে থেকে আমরা জানি, সেখানকার গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু তার মধ্যেও কী কী দুর্বলতা থাকতে পারে সেগুলোই কিন্তু এখন সামনে চলে এসেছে। গণতন্ত্রে যদি ক্রমাগত সুশাসন না করা হয়, তাহলে এটি যে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সেটি কিন্তু বোঝা গেছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে যদি একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হয়, তাহলে ঘটনাপ্রবাহ যে কী ভয়ংকর পরিণতির দিকে যেতে পারে, তার আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখলাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কিংবা আরেকটু মনোযোগী হতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।
বাইরের পৃথিবীতে ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমার মনে হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির এই ক্ষতিতে আমরা যেন আত্মপ্রসাদ অনুভব না করি। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে, সেই ঘটনা ঘটার মতো উপাদান এখন পৃথিবীর বহু দেশে বিদ্যমান। সামাজিক বিভক্তি এবং সামাজিক বৈষম্য এটার অন্যতম প্রধান কারণ। সমাজ এবং অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির যে নিবিড় যোগাযোগ, সেটি যখন সমন্বিত থাকে না, ইতিবাচক জায়গায় থাকে না, তখনই কিন্তু এ রকম বিপদ ঘটে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, আমরা আজ যাদের দেখলাম, যে মানুষগুলো এসে তাণ্ডব চালিয়েছে, এরা কিন্তু একটা বড় জনসংখ্যার ছোট একটা প্রতিনিধি মাত্র। বড় জনগোষ্ঠীটি কিন্তু এখনও সমাজে বিদ্যমান। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও তাদের মধ্যে মাইনরিটি মানসিকতা কাজ করছে। তারা বঞ্চনার শিকার বলে মনে করছেন। তারা এখনকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছেন না। তারা মনে করছেন, এই ব্যবস্থা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে না। এ রকম চিন্তাভাবনা এখনকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর বহু দেশে বিদ্যমান আছে। আমি মনে করব, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে এই বার্তা তৈরি হয়েছে। এখান থেকে সবার শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক

বিষয় : যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনার বার্তা সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ

মন্তব্য করুন