'ভাস্কর্য' বিতর্কে দেশ। পক্ষ-বিপক্ষের বক্তব্যে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন উত্তপ্ত। ধর্মীয় বিতর্কে আমাদের মনন-বিকাশে কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা আঘাত নতুন নয়। গত এক যুগের এই পথ পরিক্রমায় প্রতিক্রিয়াশীলদের দখলদারিত্ব আর রাজকীয় সম্মান দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যে ছুরি বসাচ্ছে, তারই ধারাবাহিক ফল হচ্ছে আজকের 'বঙ্গবন্ধু' ভাস্কর্য অপসারণের দাবি। 'বঙ্গবন্ধু' ভাস্কর্য সারাদেশে ঠিক কতটি আছে তা জানা নেই তবে দেশের প্রায় প্রতিটি বড় ও মাঝারি শহরে যে ভাস্কর্য রয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জানানোর জন্য এসব শিল্পকর্মকে যুগের পর যুগ ধরে মানুষ ভাস্কর্য তৈরি ও সংরক্ষণ করে আসছে। অন্তত আমাদের কয়েকশ বছর আগের ইতিহাসে সেটিই বলে। উত্তরের জনপদ নওগাঁর বদলগাছির পাহাড়পুরে, পাহাড়ের পাদদেশে টেরাকোটা দেখা যায়। সেইসব টেরাকোটায় সেই সময়ের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে রয়েছে। আর এসব টেরাকোটা আছে বলে আমরা আজও ইতিহাসে সেই সময়ের সংস্কৃতি ও জীবন ছবি স্মৃতিপটে আঁকতে পারি।

আমরা যেন এক অন্যরকম সময়কে আলিঙ্গন করে আছি, যে আলিঙ্গনে পৃথিবীর অনেক দেশের মেরুদণ্ডে চিড় ধরেছে। কোথাও কোথাও অনূভূতির প্রলয়ে 'অপরাধী'দের স্বর্গরাজ্য খ্যাত হচ্ছে। আজকের এই পৃথিবী যে প্রান্তে দাঁড়িয়ে, সেই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকে কয়েকশ বছর আগের অনগ্রসরমান চিন্তাভাবনা আমাদের জেঁকে বসেছে। যার লক্ষণগুলো ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে। দৃশ্যমান ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা সবাই জানলেও ঠিক এক অজানা কারণে অনেকেরই মুখ বন্ধ।

ভাস্কর্যবিরোধী যেসব শব্দ বাক্য ফের এখন আমরা যা শুনছি, ২০০৮ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ঢাকার বিমানবন্দরের সামনে স্থাপিত 'বাউল ভাস্কর্য' অপসারণে হারমোনিক সুরেরই যেন প্রতিফলন। সেই সময় সেই ভাস্কর্যগুলোকে টেনেহিঁচড়ে নামানো হয়। বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য সরানোর আজ যে 'যুক্তি' তারা দিচ্ছে, ঠিক একই যুক্তি দিয়ে এক যুগ আগে এই গোষ্ঠী সফল হয়েছে। কয়েক বছর আগেও সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে আরও একটি ভাস্কর্য স্থানান্তরের একই গোষ্ঠী সফল হয়েছে। তাহলে বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্যতে এসে কেন ঠেকবে? বাংলায় যে প্রবাদ আছে, খাইতে চাইলে বসতে দিতে হয়, আর বসতে দিলে শুতে চাওয়াকে 'আপনি কীভাবে' তা 'অস্পর্ধা' শামিল করবেন? আমার ধারণা, 'বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য' জায়গায় যদি রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবননান্দ দাশের ভাস্কর্য স্থাপন করা হতো, আর সেখানে যদি এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তা অপসারণের দাবি তুলত, তাহলে তারা সেখানে শতভাগই সফল হতো।

প্রগতিশীলতা মানে একদল মানুষ নাস্তিকতা মনে করে। তারা মনে করে অসাম্প্রদায়িকতা মানে হলো অন্য ধর্মে বিশ্বাস করা। ভাস্কর্য আর মূর্তিকে গুলিয়ে ফেলে সহজে লাখ লাখ মানুষের বিশ্বাসকে তারা দখল করেছে। ইউটিউবে কিংবা ফেসবুকের লাইভে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত কিংবা শিক্ষিত সব সম্প্রদায় বিনা বাক্যে তা গ্রহণ করে। তাই শিল্পীর ভাস্কর্যকে শিল্প না মনে করে, মূর্তির উপাসনাকে এক কাতারে শামিল করতে তারা দ্বিধা করেননি। পৃথিবীর বহু মনীষী বিশ্বাস করেন, যে দেশ শিল্প-সাহিত্যে যত বেশি উন্নত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিল্পের ভাস্কর্যকে সম্মান দেখানো আর সেটিকে ধর্মীয় দেবদেবী মনে করা মানুষ ঠিক কতজন আমাদের দেশে আছে? আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলামে অন্য ধর্মের বিশ্বাসের প্রতি বিষোদগার করার কথা আছে বলে আমার জানা নেই। তবে শিল্পীর ভাস্কর্যকে ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপাসক মনে করা কখনোই বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। পড়াশোনা জানা এসব মানুষ হঠাৎ করে কেন ভাস্কর্য আর মূর্তিকে গুলিয়ে ফেলছে? কেন এই দুই শব্দের মধ্যে তফাৎ করতে পারছে না?

২০০৮ সালে বাউল ভাস্কর্য অপসারণের সময় বেশ কিছু প্রগতিশীল সংগঠন প্রতিবাদ করে। 'ভাস্কর্য রক্ষা আন্দোলন' ব্যানারে এক কর্মসূচিতে তারা পাঁচ দফা দাবি তুলেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল- মুক্তিযুদ্ধ ও লোকজ সংস্কৃতিকে মূল বিবেচ্য রেখে তৎকালীন জিয়া বিমানবন্দর চত্বরে ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ, মানসম্পন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির চর্চা নিশ্চিত ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করা।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুনতাসীর মামুন, আনোয়ার হোসেন, হারুন-অর-রশিদ, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, আখতারুজ্জামান, আহমেদ কামাল, সাদেকা হালিম, ইসরাফিল শাহীন, সাইফুল ইসলাম খান, মুহম্মদ সামাদ, হাফিজুর রহমান কার্জন, পারভীন হাসান প্রমুখ শিক্ষাবিদ ২০০৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষাসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে ছিলেন।

আমরা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি, যে কারণে ভাস্কর্য আর মূর্তির বিষয়গুলো পরিস্কার হতে পারে। আমরা এমন কারিকুলাম প্রণয়ন করতে পারিনি, যেখানে পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থী শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে ভাস্কর্যকে শিল্পকর্ম চিহ্নিত করতে পারবে। মঙ্গল শোভাযাত্রা যে সংস্কৃতি তা নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে আমরা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক মানুষগুলোকে ভালোবেসে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেসব বন্ধুকে, জ্যেষ্ঠদের কয়েক বছর আগেও প্রগতিশীল চিন্তায় মগ্ন থাকতে দেখতাম, প্রতিক্রিয়াশীলতার জাল কেটে আলো ফেরানোর চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন, তারা অনেকেই যেন দিন দিন বর্ণচোরা হয়ে যাচ্ছেন।

বিদ্বেষের রেখা এতটাই দীর্ঘ হয়েছে যে, এখন যারা এই বিষয়ে কথা বলবে, তাদের নামের আগে-পিছে 'নাস্তিকতা' ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হবে। যে বিষয়টি সরকার দেখেও না দেখার কারণেই আজ এত উৎকট চিত্র দেখতে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। চিন্তাশীলতার প্রসারতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের যে দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত, পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় থাকা উচিত। এর বিপরীতে আপসের মনোভাব যে কত ভয়াবহ হতে পারে, সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে কথা উত্থাপন এরই কেবল নমুনা মাত্র। এর সঙ্গে যতটা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আছে, তার চেয়ে বড় হিসাব হচ্ছে, এক বিশাল জনগোষ্ঠীর র‌্যাপিড ট্রান্সফরমেশন। যার সুবিধা নিচ্ছে ওই গোষ্ঠী। 'ভাস্কর্য' আর 'বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য'- এর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে প্রগতিশীল দাবিদার সুশীল সমাজ বিভক্তি না নতুন কোনো সংযুক্তি তা ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে। সৃজনশীল সৃষ্টিকর্মগুলোকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে, তখন স্পষ্টত অনগ্রসরতা গ্রাস করবে এটাই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল মানুষদের কোণঠাসা আর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ সারাদেশের ভাস্কর্য রক্ষায় নিরাপত্তার চাদর কিছুতেই প্রতিক্রিয়াশীলদের উল্লম্ফন ভবিষ্যতের 'বিষবাষ্প' হিসেবে থাকছে।

আজ বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠকন্যা দেশ চালাচ্ছেন। সত্তরোর্ধ্ব এই শাসকের কাঁধে বাংলাদেশের স্বপ্ন এগিয়ে চলছে। রাজনৈতিক বির্তকের বিষয়গুলো যদি না টানি, তাহলে তার মতো বিচক্ষণ মানুষ শুধু এশিয়া নয়, বিশ্বের খুব কম সংখ্যক শাসকের মধ্যে রয়েছেন। দেশের একটি বড় অংশ তাকেই সবকিছুর ভরসাস্থল মনে করে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে যখন সাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষদের মনে ঐকতান, তখন প্রধানমন্ত্রী নীরব থাকলেও দিনশেষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এই যাত্রায় টিকে থাকবে। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো 'আগামীর দিনে' তা টিকবে তো?

স্মৃতিসৌধ থেকে শহীদ মিনার, বাউল থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভূলুণ্ঠিত হওয়াতে কতজনের হৃদয়ে দাগ কাটবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে। আমরা এমন দেখতে চাই না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত বাংলাদেশ আরও আলোকিত হোক।