'এ কার তবে কান্না!/ গান কে গাহে,- গান না!' চম্পাঝিরিতে ম্রো বাঁশির প্লুং শুনে ভ্রমণসঙ্গীদের একজন স্মরণ করছিলেন জীবনানন্দ দাশের এই লাইনটি। সত্যি, বাঁশিতে এ কোন কান্না! এমন সুর বাজাতে অনেক বেদনা লাগে। কীসের বেদনা এত! এই বেদনায় কি বর্ণমালা হারানোর সেই পুরোনো গল্প লুকানো আছে, না হাল-আমলের উচ্ছেদ আতঙ্ক?
প্লুং শব্দের বাংলা কি বাঁশি, না বাঁশের বাঁশি? বোধ হয় এর কোনোটাই নয়। ম্রোদের বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপে আমার মনে হয়েছে, এটা হবে বাঁশির অর্কেস্ট্রা বা ঐকতান। এই ঐকতান বা প্লুং বাজাতে ছোট থেকে বড় আকৃতির নানান ধরনের বাঁশি দরকার হয়। সেবার বন্ধু রূপা দত্তের ডাকে গিয়েছিলাম চম্পাঝিরিতে। চম্পাঝিরি বললে জায়গাটা চেনা কঠিন হবে। এটা আসলে বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের একটি ম্রোপাড়া। ইউনিয়নটি সর্বসাধারণের কাছে কেয়াজুপাড়া নামে পরিচিত এবং একটি বাজারও আছে এই নামে, যে বাজার থেকে পাহাড়ি পথে যেতে হয় চম্পাঝিরি। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, বান্দরবান সদর ও লামা উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সরই ইউনিয়ন। আমরা গিয়েছিলাম ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী গোহত্যা উৎসব বা চিয়াচটপ্লাই দেখতে। সেখানকার ম্রোরা নতুন ধর্ম ক্রামা অনুসারী হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই উৎসবে গরুকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার আদি রীতি রদ হয়েছে।
চম্পাঝিরি পৌঁছাতে চাটগাঁর সজীবতা, এলোমেলো বহদ্দারহাট, পটিয়া, সাতকানিয়া সবই পেলাম। চান্দের গাড়ির ঝক্কি সামলাতে গা ব্যথা হয়ে গেল। রোদের বেলার চন্দ্রযান (চান্দের গাড়ি) ভ্রমণ তেমন সুখের হলো না। যাওয়ার পথে দেখলাম, পাহাড়ের পর পাহাড়ে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বিস্তার। পাহাড়ে দখলদারিত্ব নতুন কিছু নয়, দখল চলছে এখনও। গত নভেম্বরেও চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণের নামে উচ্ছেদ করা হয়েছে ম্রোদের। ওই দখলের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে রেং ইয়ং ম্রোচ্য নাংচেন বলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী একটা অসাধারণ বক্তব্য রেখেছেন। নাংচেনের ওই বক্তব্য আমার মর্মে লেগে আছে- 'নীলগিরি কোনোদিন আমাদের নাম ছিল না, চন্দ্রপাহাড় কোনোদিন আমরা চিনি না। আমরা শোং নাম হুং নামে চিনেছি, আমরা তেংপ্লং চুট নামে চিনেছি। এই শোং নাম হুং কীভাবে চন্দ্রপাহাড় হয়ে যায়, এই তেংপ্লং চুট কীভাবে নীলগিরি হয়ে যায়? এই জীবন নগর কীভাবে তোমাদের জীবন নগর হয়ে যায়? এই ভূমি, এই মাটির প্রতিটি ইঞ্চি আমাদের বাপদাদার সম্পত্তি।'
রেং ইয়ং তার বক্তব্যে চিম্বুক পাহাড়ে একটাও প্রাইমারি স্কুল, একটাও হাইস্কুল না থাকায় আক্ষেপ জানিয়েছেন। সত্যি তো, যেখানে সরকারি কোনো স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, জলের ব্যবস্থা নেই, সেখানে পর্যটনের নামে জনপদ উজাড় করে কোন উন্নয়ন করা হচ্ছে? তাতে কারই বা ভালো হবে? বন-পাহাড় কাটতে পারি আমরা, বানাতে তো পারি না। জনজাতি উচ্ছেদ করতে পারি, যেমন এখন বান্দরবানে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণের নামে করা হচ্ছে ম্রোদের, নতুন জাতি তো গড়তে পারি না।
আমার জানা ছিল, ম্রোরা শুধু বান্দরবানেই বাস করে। ম্রো লেখক সিংইয়ং ম্রো জানালেন, ম্রোদের অল্প কিছু মানুষ আছে রাঙামাটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে। এই ম্রো লেখক-গবেষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বান্দরবান জেলায় ম্রো জনসংখ্যা ৩৮ হাজার ২১ জন। তবে ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিল পরিচালিত শুমারি অনুযায়ী সংখ্যাটা ১৯৯৫ সালেও এর চেয়ে বেশি ছিল। ম্রোদের এই কাউন্সিল প্রতিবছরই নিজস্ব শুমারি করে থাকে এবং সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী ম্রো জনসংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি হবে।
আমার অভিজ্ঞতা হলো, প্রচলিত নথিপত্রে সব সময়ই আদিবাসীর সংখ্যা, প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম দেখানো হয়। সেটা ম্রোদের বেলায় যেমন, তেমনই মান্দিদের বেলায়ও। সাঁওতালরাও মনে করে, তাদের সংখ্যাটা ঠিকঠাক তুলে আনা হচ্ছে না শুমারিতে। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও নিজস্বতায় একেবারে স্বতন্ত্র ম্রোরা। ভাষা, খাওয়া-দাওয়া, রীতিনীতি- সব আলাদা। চম্পাঝিরির দিনরাতের প্রথম দিন চেষ্টা করেও ম্রোদের ঘরের ভেতরে বসবার অনুমতি পাইনি আমরা। শুধু বাঙালির থেকে নয়, অন্য পাহাড়িদের থেকেও আলাদা ম্রোদের জীবন। খুব নিঃসঙ্গ স্বভাব তাদের। নির্জনতাপ্রিয় এই মানুষদের সুর-সংগীতও বিশিষ্ট।

ম্রো বাঁশিতে সুর তোলার কসরত করছেন লেখক

নানা রকম পাহাড়ি লতা পেঁচিয়ে সুর তুলতে ওস্তাদ ম্রোরা। আগেই বলেছি, প্লুংকে আমার কাছে বাঁশের বাঁশির একটা অর্কেস্ট্রা মনে হয়েছে। ছোট থেকে বড় বাঁশিগুলো এ রকমভাবে বানানো হয় বোধ হয়, যাতে ছোট-বড় সবাই একসঙ্গে বাজাতে পারে। বাঁশকে ম্রোরা বলে কাও। বাঁশের বাঁশিকে প্রুই। প্লুং বাজানো বাঁশিগুলোও বাঁশের তৈরি। গোহত্যা উৎসবে যেটা বাজানো হয়, সেটা হচ্ছে প্লুংয়ের সেট। এক সেটে সর্বনিম্ন ১০টা বাঁশি থাকে। তবে পরিপূর্ণ সেটে ২৫ থেকে ৪৮ ধরনের বাঁশি থাকে। একেকটা বাঁশির একেকটা কাজ। সবচেয়ে বড়টা বেইজের কাজ করে, এগুলো গম্ভীর সুর সৃষ্টি করে। সবচেয়ে ছোটটা থাকে লিড সুর হিসেবে।
প্লুংয়ের সঙ্গে সেই রাতে রাতভর শুনেছি স্তোত্রপাঠ। আদিবাসী শিশুদের জন্য গড়া রূপাদের স্কুলের একটা ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। সেটা ছিল ২০১৯ সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। পাহাড়ের নিয়ম অনুযায়ী দিনে রীতিমতো গরম লাগলেও রাতে বাঁশের বেড়া ও মাচান দেওয়া ঘরে ঠান্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। হিমের রাতে প্লুংয়ের সুরকে বলতে না পারার কান্না বলে মনে হয়েছিল আমার। স্তোত্রপাঠে বলা হচ্ছিল সেই উপকথা, যে উপকথায় রয়েছে ম্রোদের বর্ণমালা হারানোর গল্প, অভিশপ্ত হওয়ার বেদনা।
ম্রো উপকথা অনুযায়ী, ভগবান থুরাই সব জাতির উন্নয়নের জন্য পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন বর্ণমালা নিয়ে। অন্য সব জাতির প্রতিনিধিরা ঠিক সময়ে সেখানে উপস্থিত হতে পারলেও ম্রো জাতির প্রতিনিধির দেরি হয়ে গিয়েছিল যথাস্থানে পৌঁছাতে। থুরাই স্বর্গে ফিরে যাওয়ার আগে গরুর কাছে ম্রোদের বর্ণমালা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে যান। গরু বর্ণমালা নিয়ে যাচ্ছিল ম্রোদের কাছে। পথে খুব ক্ষিধে পাওয়ায় কলাপাতায় লেখা সেই বর্ণমালা খেয়ে ফেলে। অবশ্য বহুকাল পরে গত শতাব্দীর আশির দশকে মেনলে ম্রোর তৈরি করা ক্রামালিপি পাওয়ার পর বর্ণমালা না থাকার ওই আক্ষেপের অবসান হয়েছে।
ম্রোদের বেশিরভাগই মেনলে ম্রো প্রবর্তিত ক্রামা ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। মেনলের তৈরি করা বর্ণমালাকে বলা হয় ক্রামালিপি। ক্রামা ধর্মানুসারীদের কাছে প্রেরিত পুরুষের মর্যাদায় অভিষিক্ত মেনলের খুব বেশি পড়াশোনা ছিল না। আশির দশকের মাঝামাঝিতে বান্দরবান সদরের সুয়ালক এলাকায় ম্রো আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর মেনলে এসেছিলেন পড়াশোনা করতে। বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় রীতিমতো অনশন করতে হয়েছিল তার পড়াশোনার সুযোগ আদায়ে। পড়াশোনা কম হলেও জাতিগত চিন্তাশীলতা আগে থেকেই ছিল মেনলের মনে। ম্রো জাতির জীবনে তিনি এক বড় জানালা খুলে দিলেন। তার প্রচারিত ক্রামা ধর্ম হয়তো পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগুলোর একটি। মেনলের অন্তর্ধানও রহস্যঘেরা। তার অনুসারীরা মনে করেন তাদের ত্রাতা মেনলে আবার ফিরে আসবেন। ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ, প্রখর গভীরতার এই রক্ষণশীল সমাজে প্রচলিত পড়াশোনার হার দ্রুত বেড়ে গেল। ভাষার মুক্তি এলেও মূলধারার সঙ্গে সংযোগ সুখের হয়নি তাদের। একের পর এক ম্রো গ্রাম বিলীন হচ্ছে, জলের অভাবে আর আগ্রাসনের প্রকোপে হারিয়ে যাচ্ছে ম্রো সভ্যতা।
রূপাদের স্কুলে পৌঁছাতেই ম্রো শিশুদের দেখা পেয়ে ভালো লাগা পেয়ে বসেছিল। বেলাটাও পড়ে যাচ্ছিল তখন। ওই স্কুল বানাতে ওরা বেশ কিছু ওঠা-নামার পথ বানিয়েছে, জলের কল বসিয়েছে। তবে মোটামাথার পরিচয় দেয়নি এতটুকুও। পাহাড় সমান করেনি। পুরো পরিমণ্ডলটাতে কয়েকটা পাহাড়ের এঁকেবেঁকে মিশে থাকার ভঙ্গিটা অটুট আছে। স্নানের জন্য সঞ্জয়ের বানানো একটা ঢালু সিঁড়ি বেয়ে বহুদূর যেতে হলো আমাদের। স্কুলের বাচ্চারা ভোরে দূরের ঝরনা থেকে ফেরার পথে একটা করে কনটেইনার বয়ে আনে সারাদিনের জলচাহিদা মেটাতে।
বিকেল থেকেই বাঁশির সুর শোনা গেল। এই সুর জানিয়ে দিল উৎসবের আয়োজন হচ্ছে যে গ্রামটায়, তার নিশানা। সন্ধ্যা হতেই বিষাদ ছেয়ে ফেলছিল। এমন বিষাদাক্রান্ত উৎসব আমি আর দেখিনি। হয়তো আমাকে না অনেককেই বিষাদ ছুঁয়ে গিয়েছিল সেই রাতে। সারারাত পাগলাটে সব ঘটনা ঘটছিল। শেক্সপিয়রের 'গ্রীষ্মের মধ্য রজনীর স্বপ্ন' মনে পড়ছিল আমার। পাহাড়ি নির্জনতা চারধারের ঘন অন্ধকারে বিরাজিত ছিল। তবুও উৎসবমুখর গ্রামটা সেদিন জেগেই ছিল। প্লুং বাজছিল। সবাই ঘুরে ঘুরে নাচছিল। বিষাদ ছেয়ে ফেলছিল আমাদের। সমস্ত পাহাড়কে। এত বেদনা কীসের? বাঁশির সুরেই বা এত বেদনা কেন? হয়তো সেই বেদনা অব্যক্ততার, অসহ্য কঠিন জীবনকে সংজ্ঞা না দিতে পারার, শেকড় থেকে উচ্ছেদের।

বিষয় : বন-পাহাড়ের দেশে

মন্তব্য করুন