বিদেশে পলাতক দুর্নীতি মামলার আসামি প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ও তার সহযোগীদের তিন হাজার কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে ওই পরিমাণ টাকা ফ্রিজ করেছে। দুদক সূত্রে এই খবর জানা গেছে।

জানা গেছে, এরই মধ্যে দুদকের উপপরিচালক অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে থাকা ওই পরিমাণ টাকা ফ্রিজ করতে বিএফআইইউতে চিঠি দেন। তার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের ওই পরিমাণ টাকা ফ্রিজ করা হয়। ৩০টি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে জালিয়াতি করে ঋণের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছিল ওই তিন হাজার কোটি টাকা। দুদক সূত্র জানায়, দেশে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত প্রভাবের সঙ্গে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতেন পি কে হালদার। নিজের আখের গোছাতে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও পিপলস লিজিংয়ে। তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডিও ছিলেন তিনি। পিপলস লিজিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না থাকলেও সুকৌশলে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

জানা গেছে, পি কে হালদারের বিরুদ্ধে দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। প্রতারণা, জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজারে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, পি কে হালদার রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে এমডি থাকা অবস্থায় প্রভাব খাটিয়ে তার আত্মীয়-স্বজনকে বেশ কয়েকটি লিজিং কোম্পানির ইনডিপেনডেন্ট পরিচালক নিযুক্ত করেছিলেন। একক কর্তৃত্বে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় পিপলস লিজিংসহ বেশ কয়েকটি লিজিং কোম্পানির টাকা আত্মসাৎ করেন। এর মধ্যে পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীদের তিন হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করে কোম্পানিটিকে পথে বসিয়েছেন। কর্তৃত্ব খাটিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে দেন। আমানতকারীদের শেয়ার সংক্রান্ত পোর্টফোলিও থেকে শেয়ার বিক্রি করা হয়। ৩০টি কোম্পানি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণের নামে আত্মসাৎ করা হয় তিন হাজার কোটি টাকা। সেসব প্রতিষ্ঠানের নামে আত্মসাৎ করা তিন হাজার কোটি টাকা বিএফআইইউর মাধ্যমে ফ্রিজ করা হয়েছে। এ অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদক উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, জনৈক নওশেরুল ইসলাম ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস লিজিং ও পিপলস লিজিং থেকে ২০১৫-২০১৯ সাল পর্যন্ত তার একাধিক হিসাবে জমা করেছেন তিন হাজার ৫২০ কোটি টাকা। পরে উত্তোলন করেন দুই হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। তার ব্যাংক হিসাব থেকে ফ্রিজ করা হয় ৯৫২ কোটি টাকা। মমতাজ বেগম ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে কয়েক বছরে তার একাধিক হিসাবে জমা করেছেন চার কোটি টাকা, উত্তোলন করা হয় আড়াই কোটি টাকা। তার হিসাব ও তাদের হিসাব থেকে ফ্রিজ করা হয় দুই কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

বাসুদেব ব্যানার্জী ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে তার একাধিক হিসাবে জমা করেছেন ৭৬৪ কোটি টাকা, উত্তোলন করেছেন ৪৬২ কোটি টাকা। তার হিসাব থেকে চার কোটি ৬৪ লাখ টাকা ফ্রিজ করা হয়। পাপিয়া ব্যানার্জী কয়েক বছরে ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে তার একাধিক হিসাবে জমা করেছেন পাঁচ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, উত্তোলন করেছেন ৩৪ কোটি। তাদের হিসাব থেকে ফ্রিজ করা হয় ৬১ লাখ টাকা।

দুদক জানায়, পি কে হালদারের বন্ধু মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক একেএম শহীদ রেজার স্বার্থ সংশ্নিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে ১০৪ কোটি টাকা ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সাতটি ঋণ হিসাব থেকে ৩৩টি চেকের মাধ্যমে ওয়ান ব্যাংকের একটি শাখার গ্রাহক ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান আহমেদ খানের জে.কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে পরিচালিত একটি হিসাবে ৭৪ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

পি কে হালদারের ব্যক্তিগত একটি হিসাবে ১৫৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা ও সমপরিমাণ উত্তোলনের তথ্য মিলেছে, যা একজন ব্যাংকারের স্বাভাবিক লেনদেন নয়। ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদের ২০১তম সভায় ৬০ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক ও ইসি ও অডিট কমিটি প্রধান একেএম শাহেদ রেজার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পদ্মা ওয়েভিং, পদ্মা ব্লিচিং ফ্যাশান প্লাসের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পরিচালিত হিসাবগুলোয় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।

কনিকা এন্টারপ্রাইজের নামে চলতি মূলধন ঋণ নেওয়া হলেও ঋণের কোনো অর্থ কনিকা এন্টারপ্রাইজের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরিত হয়নি। ঋণের অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী অন্যরা। সেসব সুবিধাভোগী সম্পর্কে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৮ মার্চ তিনটি চেকের মাধ্যমে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা টোটাল ট্রান্সপোর্টেশন লিমিটেডের নামে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ০১১১০৩৮০৬০১ নং হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই বছরের ১০ ও ১৫ মার্চ তিনটি চেকের মাধ্যমে ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকা স্বপন কুমার মিস্ত্রির মালিকানাধীন সন্দ্বীপ করপোরেশনের নামে ব্যাংক এশিয়ার ধানমন্ডি শাখার ০২১-৩৩০০১৫৪৫ নং হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা সাদাব হোসেনের নামে মেঘনা ব্যাংকের প্রধান শাখায় পরিচালিত ১১০১-২৫৩০০০০১৮২১ নং হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আনান কেমিক্যালের এমডি অমিতাভ অধিকারী, বর্তমান পরিচালক ও চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী, পরিচালক অনিতা কর (উজ্জ্বল কুমার নন্দীর স্ত্রী) হলেও এর সুবিধাভোগী ছিলেন পি কে হালদার। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ৭০ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণ নিলেও একটি টাকাও ব্যবসার কাজে ব্যবহার না করে সব টাকাই বিভিন্ন জনের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে পরে উত্তোলন করা হয়, যা ফান্ড ট্রান্সফার- এটি মানি লন্ডারিং অপরাধ।

জানা গেছে, অমিতাভ অধিকারী হলেন পি কে হালদারের আপন খালাতো ভাই ও উজ্জ্বল কুমার নন্দী হলেন পি কে হালদারের পুরোনো সহকর্মী। অন্যদিকে উজ্জ্বল কুমার নন্দী পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান হিসেবে ও অমিতাভ অধিকারী পিপলস লিজিংয়ের পরিচালক হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে টাকা স্থানান্তর করে সেই টাকা দিয়ে পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হন। পরে একই কায়দায় পিপলস লিজিং থেকে টাকা বের করে প্রতিষ্ঠানটিকে পথে বসানো হয়।

সূত্র জানায়, বেশিরভাগ ঋণের ক্ষেত্রে জামানত ছিল না, থাকলেও তার পরিমাণ খুবই নগণ্য, কিছু ক্ষেত্রে জামানত নেওয়ার কথা থাকলেও পরে নেওয়া হয়নি। অথচ ঋণ হিসাব থেকে সব টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ঠিকই। এ জন্য ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের বোর্ড অব ডিরেক্টরস এবং চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

সেসব ঋণ কেলেঙ্কারীর সঙ্গে পি কে হালদারের সহযোগী ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল ইসলাম, সাবেক সিএফও আবেদ হোসেন ও হেড অব বিজনেস আহমেদ সরাসরি জড়িত। মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।