চলমান পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠ হঠাৎই গরম হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সংঘাত-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথম ধাপের পৌর নির্বাচন কিছুটা শান্তিপূর্ণ হলেও দ্বিতীয় ধাপে ব্যাপক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে সেখানেও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, অনেক দিন পর দেশজুড়ে বড় আকারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কারণেই সংঘাত-সহিংসতা বেড়েছে। কারণ, এ ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীসংখ্যা অনেক বেশি হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবেও অনেকে প্রার্থী হন। 'বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে সংকট অনেক পুরোনো। প্রার্থীরা প্রত্যেকেই চান প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে। ফলে এক দলের প্রার্থী অন্য দলের প্রতিপক্ষ, এমনকি নিজ দলের প্রার্থীর সঙ্গেও বিরোধে জড়ান। প্রার্থী-প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থক-সমর্থকে সহিংসতা বেড়ে যায়।

পৌর নির্বাচন নিয়ে সর্বশেষ সহিংসতা হয়েছে সিরাজগঞ্জে। সেখানে গত শনিবার ভোট গ্রহণ শেষে বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থী বিএনপির সমর্থক তারিকুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় তার সমর্থক নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে তারিকুলকে হত্যা করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে গত বুধবার ঝিনাইদহের শৈলকূপা পৌরসভার নির্বাচনকে ঘিরে নিহত হয়েছেন কাউন্সিলর প্রার্থী আলমগীর হোসেন এবং প্রতিপক্ষ প্রার্থী শওকত হোসেনের ছোট ভাই ও আওয়ামী লীগ কর্মী লিয়াকত হোসেন বল্টু।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে পাঠানটুলী এলাকায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে আজগর আলী বাবুল নামের একজন নিহত হন। এ ছাড়া শনিবার ৬০ পৌরসভায় নির্বাচন চলাকালে কয়েকটি এলাকায় সংঘাত এবং আগে-পরে কয়েকটি সহিংসতায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

অবশ্য এসব সহিংসতার মধ্যেও চলতি পৌর নির্বাচনে বেশ কয়েক বছর থেকে চলে আসা 'ভোটার খরা' কাটতে শুরু করেছে। শনিবার অনুষ্ঠিত দ্ব্বিতীয় ধাপের ৬০ পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। প্রায় সব জায়গাতেই মানুষ লাইন ধরে ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ভোট দিয়েছেন।

সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভায়- ৮৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের ২৪ পৌরসভা নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানেও ভোটার উপস্থিতি ও পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছিলেন প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, প্রথম ধাপের নির্বাচনে গড়ে ৬৫ দশমিক ৬ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতাকে 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। এসব কমাতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কামনা করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। বিপুল ভোটার উপস্থিতিকে সরকার ও দলের পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি দেশের মানুষের 'আস্থা বৃদ্ধি' হিসেবে দেখছেন ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা। সেই সঙ্গে ইভিএম পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মানুষের ভোটদানের আগ্রহকেও ইতিবাচক বলে মনে করছেন তারা।

তবে নির্বাচনী সহিংসতা বৃদ্ধিতে নির্বাচন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির 'আস্থাহীনতা' আরও বেড়েছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনও নিশ্চিত হয়নি। ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীরা যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে জিততে মরিয়া হয়ে পড়েছেন। তারাই সহিংসতা সৃষ্টি করে মাঠ উত্তপ্ত করে তুলছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি নির্বাচন কমিশনও।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা রাজনীতিতে এমন অসহিষুষ্ণতায় উদ্ব্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, চলতি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা বৃদ্ধির বিষয়টি সন্তোষজনক। তবে সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে চলেছে, যা উদ্বেগজনক। সরকার ও তার প্রশাসনের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামীতে আরও খুনোখুনির ঘটনা ঘটবে।

পাশাপাশি নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার তাগিদ দিয়ে তারা বলেছেন, এটি করা গেলে আরও বেশি সংখ্যক বিরোধী দলকে যেমন ভোটের মাঠে টানা যেত, তেমনি ভোটার উপস্থিতিও বাড়ত।

উজ্জীবিত আওয়ামী লীগ: দু'ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি আওয়ামী লীগকে আশাবাদী করে তুলেছে। স্বস্তি এনে দিয়েছে। এটি বিরোধী মহলের সমালোচনার মোক্ষম জবাব দেওয়ার সুযোগও এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক নেতারা।

অন্যদিকে দুই ধাপের পৌর নির্বাচনেই মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয় আওয়ামী লীগকে আরও উজ্জীবিত করে তুলেছে। পরবর্তী ধাপের পৌরসভা নির্বাচনগুলোতেও এ বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা।

২৮ ডিসেম্বরের প্রথম ধাপের ২৩টি পৌরসভা নির্বাচনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৮টি, বিএনপি দুটি এবং তিনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মেয়র পদে বিজয়ী হন। শনিবারের দ্বিতীয় ধাপের ৬০টি পৌরসভার মধ্যে ৪১টিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। আরও চার পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা আগেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপির চারজন, জাতীয় পার্টির একজন, জাসদের একজন ও আটজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল রোববারের সংবাদ সম্মেলনে সিরাজগঞ্জে একজন নিহত হওয়ার ঘটনাকে 'দুঃখজনক' বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। ভবিষ্যতে তাদের আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, এই নির্বাচনে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি শেখ হাসিনার সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের অব্যাহত আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। তা ছাড়া এটা ইভিএমের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে। কেননা ইভিএমে ভোট প্রদানে জনগণের আগ্রহও এখন অনেক বেড়েছে।

বিএনপির আস্থাহীনতা বেড়েছে: দলটির নেতারা বলছেন, সংঘাত সহিংসতা তো আছেই, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যেসব শর্ত রয়েছে- তার কোনোটাই এই নির্বাচনে মানা হচ্ছে না। বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের কারও কোনো নিরাপত্তাই নেই। প্রচার-প্রচারণায় এখনও আগের মতোই বাধা দেওয়া হচ্ছে। দলীয় কার্যালয়ে তালা মেরে দেওয়া হচ্ছে। হামলা-মামলা করে বিএনপির এজেন্টদের এলাকাছাড়া করা হচ্ছে। এর বাইরে নির্বাচনকেন্দ্রে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ভোটচুরি, জাল ভোট দেওয়া ও হুমকি দেওয়ার বিষয়গুলোও রয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, ভোটারদের উপস্থিতি বাড়লেও ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতাসীনরা পৌরসভা দখল করেছে। প্রতিটি নির্বাচনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কেন্দ্র দখল ও ভোট ডাকাতি করেছে। এমনকি সিরাজগঞ্জে খুন পর্যন্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, ইভিএমে ভোট নিয়েও সরকার সম্পূর্ণ কারসাজি ও কারচুপি করছে। মোটকথা, সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।

সুশীল সমাজের উদ্ব্বেগ: সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবক্ষয়ের কারণেই নির্বাচনে অসহিষুষ্ণতা ও সন্ত্রাস-সহিংসতা বাড়ছে, যা গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ নির্বাচন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই ভেঙে দিচ্ছে। এগুলো ভেঙে যাওয়ার অর্থ, আমরা জঙ্গলের শাসনের দিকে ধাবিত হবো। এটা একটা অশনিসংকেত।

বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, এ দেশে যে কোনো নির্বাচনেই সহিংসতা হয়ে থাকে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার যেটা হচ্ছে, এতটা আগে হয়নি। এর পেছনে প্রধান কারণ নষ্ট রাজনীতি। দ্বিতীয় কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার কারণে সহিংসতা বেশি হচ্ছে। তৃতীয় কারণ- মানুষের ভেতরে রাজনৈতিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। সে কারণে এসব সহিংসতা ঘটছে এবং মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। দেশে স্বাভাবিক রাজনীতি থাকলে মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ থাকত। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তবে পৌরসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধিতে সন্তোষও জানিয়েছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, গত কয়েকটি নির্বাচনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে চলমান পৌরসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অনেকটাই বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। তবে নির্বাচনগুলো আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক হলে ভোটার উপস্থিতি আরও ১০ ভাগ বাড়ত বলেই মনে হয়।

মন্তব্য করুন