দখলদারদের হাতে চলে গেছে ঢাকা শহর সমন্বিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় সাড়ে ১৮ কিলোমিটার এলাকার দু'দিকের জমি। এসব জমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। একইভাবে দেশজুড়ে বেদখল হয়ে পড়েছে পাউবোর প্রায় সাত হাজার একর জমি, যার আনুমানিক দাম প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ১৭১ জন দখলদার পাউবোর এসব জমি দখল করে রেখেছেন।

সম্প্রতি সংস্থার জায়গায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনার তালিকাসহ একটি প্রতিবেদন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পাউবো। এতে এই চালচিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির অধিগ্রহণ করা এসব জমি ভুয়া অবমুক্ত দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ড করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের সহায়তায় পাউবো ভূমি উদ্ধারের অভিযান অব্যাহত রেখেছে। যদিও সফলতা মিলছে খুবই কম। তা ছাড়া আইনগত প্রতিবন্ধকতা এবং জটিলতায়ও অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধার তৎপরতা।

বছরের পর বছর ধরে মূলত রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালী দখলদাররা পাউবোর এসব জায়গা নিজেদের কব্জায় রেখেছেন। দখলদাররা এসব জমিতে বহুতল ভবন, আবাসন প্রকল্প, বিপণিবিতান, স্কুল-কলেজ, ডেইরি ফার্ম, গাড়ির গ্যারেজ, মাছের ঘের ইত্যাদি গড়ে তুলেছেন। কেউবা গড়ে তুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পাউবো ও স্থানীয় ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় এসব জমি বেদখল করা হয়েছে। অনেকে ভুয়া দলিল করে তা রেজিস্ট্রিও করে নিয়েছেন।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০টি জোনে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমির পরিমাণ দুই লাখ ৫৬ হাজার ৩৫ একর। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ব্যবহার হচ্ছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৩৫ একর। প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণে সংরক্ষিত জমি ১৮ হাজার ৮৯৯ একর।

সম্প্রতি পাউবো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের বেদখল হওয়া জমির তালিকা প্রস্তুত করেছে। অনেক দখলদার আদালতে মামলা করায় এর আগে বিভিন্ন সময় সংস্থাটির বেদখল ভূমি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে এবার জোরেশোরে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পাউবো।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার সমকালকে বলেন, অবৈধ দখলে থাকা পাউবোর জমি উদ্ধারে তৎপরতা চলছে। ইতোমধ্যে কিছু কিছু এলাকায় জমি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন জেলার প্রশাসকদের কাছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

দখলদার কারা :রাজধানীর ঢাকা শহর সমন্বিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের শাহআলী, দারুসসালাম, জহুরাবাদ, হরিরামপুর এলাকার সাড়ে তিন কিলোমিটারের উভয় পাশেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। দখল হওয়া এসব জমির বেশির ভাগ এলাকাতেই রয়েছে বেড়িবাঁধ, ছোট ছোট নদী ও জলাশয়। দখলদাররা এসব জমিতে আবাসন প্রকল্প, বিপণিবিতান, স্কুল-কলেজ, ডেইরি ফার্ম, গাড়ির গ্যারেজ ইত্যাদি নির্মাণ করেছেন।

এখানে গোড়ানচট বাড়ি মৌজার জমি দখল করে রেখেছেন শাহআলী থানার গোড়ানচট বাড়ির আজগর আলী, লোকমান হোসেন, ডা. একে এম আব্দুস সালাম, হাজী মোহাম্মদ সেলিম, নবাবের বাগ উত্তরপাড়ার আজগর আলী, আলকাস মিয়া, রেজাউল হক ভূঁইয়া বাহার, ফাহিবা করপোরেশনের মালিক ফারুক আহমেদ, মেসার্স শফিকুল এন্টারপ্রাইজের মালিক ফজলুল হক, মেগা স্টিল সিস্টেম লিমিটেডের মালিক কাওসার হোসেনসহ ২১ জন।

এ ছাড়া নবাবের বাগ মৌজায় আব্দুল আলিম, নাহিদ, আব্দুল আজিজ, মিসেস আসমা বেগম, আবু কালাম, দেলোয়ার হোসেনসহ ২১ জন; বিশিল মৌজায় হাজী ওসমান গণি, খোকন মিয়া, বাদশা মিয়া, কাজীপুর কাঁচাবাজার মসজিদ, রুহুল আমিন, মানিক মিয়া, তুরাগ সিটি ইউর রিয়েল এস্টেট লি., সাইফুল ইসলামসহ ২৮ জন; একই থানার ছোট দিয়াবাড়ি মৌজায় বাপ্পা সিকদার, মিসেস মনি আক্তার, মিনারা বেগম, আজিজ সিকদার, টিপু কাজী, মোকলেছ খান, আব্দুল হাকিম, মেসার্স আপন সিন্ডিকেটসহ ৩০ জন পাউবোর জমি দখল করে রেখেছেন।

এছাড়াও দারুসসালাম থানার অধীন জহুরাবাদ মৌজায় আমজাদ মোল্লা, মো. স্বপন, রূপবান, জাহিদ হোসেন, বাবুল মিয়া, ফারুক খান, আব্দুর রশিদ, আবু তাহের মিয়া এং হরিরামপুর মৌজায় হরিরামপুরের দিলু মাহাজন, আবুল কাশেমগং, আলী আকবর, হুমায়ুন কবিরগং ও ছায়েম মণ্ডল পাউবোর জায়গা দখল করে রেখেছেন।

ষাটের দশকে নির্মাণ করা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯ হাজার ২২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে আট হাজার ৪২৯ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, চার হাজার ৭৫০ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ, দুই হাজার ৪৩৬ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ এবং সেচ খালের ডাইক বাঁধ রয়েছে তিন হাজার ৬১২ কিলোমিটার। সারাদেশের প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ওপর পাঁচ হাজার ৩৩১ কিলোমিটার সরকারি বিভিন্ন সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এলজিইডি এসব বাঁধের মধ্যে চার হাজার ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণ করেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং সিটি করপোরেশন এক হাজার ৩২৩ কিলোমিটার ও বিভিন্ন পৌরসভা বেড়িবাঁধের ওপরে রাস্তা নির্মাণ করে দখল করেছে ৮৭০ কিলোমিটার। যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এসব বাঁধ ভাঙার শঙ্কা দেখা দেয়। অথচ বাঁধ উদ্ধারে তেমন কোনো তৎপরতা নেই। বন্যার পানিতে উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলায় কয়েকশ কিলোমিটার বাঁধ বিলীন হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে পাউবোর দায়িত্বশীল এক প্রকৌশলী বলেন, পাউবোর বেদখলে যাওয়া সাত হাজার একর জায়গার বেশির ভাগই বেড়িবাঁধ এবং ছোট ছোট নদী ও জলাশয়। এগুলো উচ্ছেদের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন জেলায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। যদিও জেলা প্রশাসন থেকে তেমন সাড়া মিলছে না।

মন্তব্য করুন