রঞ্জন দাদার দাওয়ায় বসে সারারাত গল্প করাটা আমাদের প্রিয় কাজ ছিল। রঞ্জন দাদা মানে রঞ্জন নকরেক। তার জন্মগ্রাম বেদুরিয়া। বিয়ের পর দাদা জামাই হয়ে এসেছেন চুনিয়ায়। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার এই গ্রামটির কথা বারবারই আসবে আমার বন-পাহাড়ের এই গল্পে। এখানেই বনের ধারে বেড়াতে এসে আমি আদিবাসী মান্দিদের মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েছি। চুনিয়া থেকে বেদুরিয়ার দূরত্ব বড়জোর পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার। সাধারণত যাদের গারো বলে ডাকা হয়, তারা নিজেদের মান্দি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। মাতৃতান্ত্রিক মান্দি সমাজে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই হয়ে যায় পুরুষের ঠিকানা। ব্যতিক্রমও আছে, আজকাল অনেক মেয়েও আসে শ্বশুরবাড়িতে সংসার পাতবে বলে। রঞ্জন নকরেকের বেলায় ব্যতিক্রম হয়নি। চুনিয়া এখন তার ঠিকানা।
রঞ্জন নকরেক আমার গুমি। বাংলায় গুমি অর্থ দুলাভাই। মান্দিদের একজন মানুষ কেমন করে আমার দুলাভাই হয়ে গেলেন, সেটা অনেক বড় গল্প, নিশ্চয়ই অন্য কোনো দিন সেই গল্প বলব। ওই পরিবারে আমি একজন সদস্যের মর্যাদা পাই। আজকাল যাওয়া-আসা উৎসবকেন্দ্রিক হয়ে গেলেও মাত্র কয়েক বছর আগে ছুটি পেলেই ছুটে যেতাম চুনিয়ায়।
দিন-রাত একাকার করে আড্ডা দিয়েছি তখন। গুমির বাড়ির বারান্দাতেই আড্ডা জমত আমাদের। আড্ডায় বেশির ভাগ সময় অন্তত সাত-আটজন সঙ্গী মিলত। অলকা (মৃ) দিদি, তার স্বামী (মনোরঞ্জন চাম্বুগং), কয়ন (মৃ) দিদি, মেজনী (মৃ) দিদি, কয়ন দিদির ছেলে বিকাশ মৃ, বুলবুল মৃ, পরাগ রিছিল সব দিনই থাকতেন। গৃহস্বামী রঞ্জন নকরেক তো সে আসরে থাকতে বাধ্য ছিলেন, তার বারান্দা বলে কথা। পূর্ণিমা নকরেক এবং শাওন রুগাও আসত মাঝেমধ্যে। শাওন আমার ছেলে, পূর্ণিমা মেয়ে। আমি তাদের কাউকে পেটে ধরিনি। কিন্তু দুই পরিবারের এই ছেলেমেয়ে দুটি মা বলে ডাকে আমাকে। আমিও মনেপ্রাণে ওদের মা হয়ে পড়েছি। গৃহকর্ত্রী বিজন্তী (মৃ) দিদি তার নাতনি খাবিয়াকে ঘুম পাড়াবার পর রোজ আর জেগে উঠতে পারতেন না। তাই তার ঘরে আড্ডা হলেও আমাদের সেই আড্ডায় তিনি ছিলেন অনিয়মিত সদস্য। মান্দিদের আচিক ভাষার ঐতিহ্যবাহী রেরে গানের সুর ধরত পরাগ গায়ক বোনদের উসস্কে দেওয়ার জন্য। অনেক রাত পর্যন্ত চলত কয়ন দিদিদের গান।
অলকা দিদি এখন শয্যাশায়ী। তার বর, আমার গুমি মনোরঞ্জন দিদিকে রেঁধেবেড়ে খাওয়ান। মেজনী দিদির দুঃখ, তার মেয়ে আর জামাই তাকে কষ্ট দেয়। 'স্বামী ছাড়া নারী, দেউড়ি ছাড়া বাড়ি'র উদাহরণ দেন তিনি। তাকে আগলাবার কেউ নেই বলে আক্ষেপ করেন। কয়ন দিদি বিদ্যাভারে আরও পূর্ণ হচ্ছেন। তার মধ্যে মোহমুগ্ধ করে রাখার মতন জাদু আছে। উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারে মেজনী দিদির দক্ষতা মুগ্ধ হওয়ার মতো। আমার মনে হয় এই জাদু মান্দিদের সবার মধ্যেই কমবেশি আছে। আড্ডার রাতগুলোতে অন্ধকারের রূপ আর মান্দিদের মায়ার জাদুতে মগ্ন হয়ে থাকতাম আমি। সবাই বলে মান্দিরা তুকতাক জানে। সত্যি সত্যি জানে হয়তো। আপনারা আবার কথাটাকে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন না।
তবে আমার মনে হয় আমি সেই তুকতাকেই আটকে আছি।
সেই দিনগুলোর এক রাতের গল্প বলি। সেদিন একটু বৃষ্টি ছিল বলে মনে পড়ছে। গুমির বৈষয়িক অবস্থার খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম আমি। তার পরেই ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতাটা মাথাচাড়া দিল। তিন পাখি জমি মেদি নিয়ে আনারস বাগান করলে দু-তিন বছরের মধ্যে দিদির পরিবার সচ্ছলতার মুখ দেখবে- সেটা একেবারে দিব্যচোখে দেখতে পেলাম। এক পাখিতে তেত্রিশ শতাংশ। মেদি মানে বর্গা নেওয়া, তবে ঠিক বর্গাও নয়, ইজারা নেওয়ার মতো অনেকটা। গণিতশাস্ত্র আর বিষয়বুদ্ধির পুরো জ্ঞান ঢেলে দিয়ে বোনের পরিবারের অভাব মোচনের ছবিটা ভেবে ফেললাম। সকালের শান্ত মাথায় চাষাবাদের পরিকল্পনা থেকে কেটে পড়ার লোক আমি মোটেও নই।
পাহাড়ে করা জুম চাষের সঙ্গে আমাদের সবারই অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। কিন্তু বনে? মধুপুরের বনাঞ্চলের মান্দি, অর্থাৎ গারো প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ করে বুঝতে পেরেছি, সর্বশেষ কবে এই বনে জুমচাষ হয়েছিল, তা ঠিকঠাক তাদের স্মরণে নেই। কেমন ছিল বনের এই জুম চাষ। বনের নিচু জমি, যা 'বাইদ' বলে পরিচিত, সেসব জমিতে এখনও চাষাবাদ হয়, তবে লাঙলের ফলা চালিয়ে প্রকৃতিকে বিদীর্ণ করা চাষাবাদ। অথচ একদা এখানে বনের উৎকর্ষ সংরক্ষণ সাপেক্ষে জঙ্গল পুড়িয়ে পরিস্কার করে জুম চাষ করার অনুমোদন ছিল মান্দিদের। কবে থেকে মধুপুর গড়ের এই বনে জুম চাষ বন্ধ হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রবীণদের সরল ভাষ্য- 'হবে ব্রিটিশ আমলে।' ১৯৫৫ সালে মধুপুর বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। গত শতকের ষাটের দশকের প্রথম দিকে এই বনাঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে জাতীয় উদ্যান গঠিত হয়। তখন থেকে এই বনে যে জুম চাষ বন্ধ হয়ে গেছে, এটা নিশ্চিত। তার কিছু আগেও এসে থাকতে পারে বিধিনিষেধ। তবু এখনও জুম রক্ষার জন্য হাবাচুরা আমুয়া মানে পূজার আয়োজন করা হয়। ধর্মান্তরের কারণে সাংসারেক রীতির এই গৃহপূজাটি সব ঘরে সমান শ্রদ্ধা পায় না আর।
হাবাচুরা পূজা নিয়েও আরেকদিন লিখব নিশ্চয়ই। পূজার উপাচার নির্মাণে গুমির জুড়ি নেই। আপাতত সেই গল্পও থাকুক, এখন বরং রঞ্জন গুমির চাষাবাদের গল্পটাই শেষ করি।
পরের সপ্তাহেই দুই পাখি জমি মেদি নিলাম আমরা। তিন বছরের জন্য। বর্ষার শেষে জমির লেনদেন হলো। জমি নেওয়ার পর চাষ করার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার ছিল না। তাই কম খরচে হলুদ লাগানোর কথা ভাবলাম আমরা। হলুদের সময় না তখন। আদা লাগালে পোকা ধরে যেতে পারে। হলুদ লাগালে পানি উঠলে বিপদ হবে- এসব জানালেন গুমি। তারপর বললাম, শীতের আগে আলু আর সবজি তো লাগানো যায়। গুমি রাজি হলেন। আমি ফিরে এলাম। গুমি বললেন, বৃষ্টি হলো, মাটি শুকানোর অপেক্ষা করছি। পরের সপ্তাহে গুমি বড়বাড়ির জমিতে কামলা দিতে গেলেন। বললেন, সবজি আরও পরে লাগাতে হবে। অবশেষে ওই শীতকালে আমাদের মেদি নেওয়া জমি বিরান পড়ে থাকল। আমি হতাশ, অবাক এবং বেদনাকাতর হলাম। তারপর ভাবতে বসলাম, কী হলো? কেন হলো? আমার বিস্মিত হতে আরও বাকি ছিল। শীত শেষে আনারসের সিজনটাও এভাবে চলে গেল। পরের বর্ষায় গুমি ওই জমি অন্য একজনকে আবার মেদি দিলেন। চাষাবাদ হচ্ছে না, নাতনির দুধ কেনার টাকাও থাকছে না ঘরে। মাঝেমধ্যে স্বামী-স্ত্রীতে দিনমজুরের কাজ করে ছয়জনের চাল কেনাও কঠিন। এ অবস্থায় জমি আবার মেদি দিতে হলো।
খুব রাগ হচ্ছে নাকি? দায়িত্বহীন মনে হচ্ছে কি আমার গুমি মানুষটাকে? তিনি কি অলস? না। কারণ, কঠিন পরিশ্রম তিনি নিত্যই করছেন। ঘরের চাল ছাওয়া, দরজা লাগানো থেকে শুরু করে সব কাজ তিনি নিজে করেন। শ্বশুর শতবর্ষী সাংসারেক গুরু জনিক নকরেকের ফরমায়েশমতো দেবদেবীর মূর্তিসহ পূজার সব উপাচার গড়ে দেন যখন-তখন। মাঠের কাজ তিনি করেন নিজের বাড়ির আঙিনায়। কৃষিশ্রমিক হিসেবেও যান। একটা বাড়ির কৃষি সম্পর্কিত কাজও তিনি দেখাশোনা করেছেন অনেক দিন ধরে। তাহলে কৃষিক্ষেত ব্যবস্থাপনার কাজও তার কাছে কঠিন না। অন্য ব্যাপারে কখনও তিনি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেননি। তবে ফসল না লাগানোর কারণ কী? কারণটা আমি ঠিক করে জানি না। টাকা নেই- তা বলতে না পারা ছাড়া অন্য কোনো কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
শুধু বীজ কেনার সামর্থ্য আমার গুমির ছিল না। আমারও আর টাকা ছিল না তখন। কারও কাছে চাইতে হলে আমি শরমে মরে যাই। আমার গুমিও চাইতে পারেন না। মান্দি স্বভাবের দারুণ ঋজুতা, তাকে বলতে দেয়নি, তার কাছে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা সংগ্রহ করার কোনো সুযোগই বাকি ছিল না। ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার কাছে ধার আগে থেকেই ছিল। তিনি আশা করেছিলেন, আমি বুঝতে পারব। আমি ভেবেছিলাম, এটুকু তিনি পেরে উঠবেন। দ্বিমুখী অভাব এবং বলতে না পারা আমাদের প্রকল্পটাকে ডুবিয়ে দিল। বলতে না পারা, গুছিয়ে উঠতে না পারা, ব্যর্থ হতে থাকা- মান্দি জীবনের প্রায় নিয়মিত ঘটনা। এসব ব্যর্থতার পরও বিশ্বাস আছে রঞ্জন গুমির ওপরে। আপাত দায়িত্বহীন মানুষটা মোটেও দায়িত্ববোধহীন নন- সে তো আমি প্রতিদিন দেখছি। প্রকল্পটা সচরাচরের মতো ব্যর্থ ছিল। বিশ্বাসটা তবু সব সময়ের।

বিষয় : বন-পাহাড়ের দেশে

মন্তব্য করুন