বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সিবিএর অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় বিপাকে পড়েছেন সংস্থাটির তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র ভৌমিক। বিআইডব্লিউটিএ ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সদস্য সচিব বাবুলকে এরই মধ্যে সাময়িক বদলি করা ছাড়াও কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সিবিএ নেতাদের প্রভাবে সংস্থার কর্মকর্তারা তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

জানা গেছে, বাবুল চন্দ্র ভৌমিক বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জের ড্রেজিং বিভাগের ড্রেজার বেইজের অধীন 'টাগ-দুর্নিবার' নামের জাহাজের ড্রাইভার-১ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিআইডব্লিউটিএ ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সদস্য সচিব হিসেবে বাবুল গত বছরের ২১ ডিসেম্বর সংস্থার সিবিএ নেতাদের অবৈধ ও বেআইনি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সংস্থার চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগপত্র পেশ করেন। এরপর থেকেই তার ওপর নানা চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গত ২১ জানুয়ারি প্রথমে তাকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রিজার্ভ করা হয়। পরে ২৫ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে খুলনার 'ড্রেজার পায়রা'র ড্রাইভার-১ হিসেবে সাময়িক বদলি করা হয়। বদলিকৃত পদে যোগদান না করলে বিভাগীয় মামলাসহ বিনা বেতনে ছুটি দেখানোর আশঙ্কা থাকায় বাবুল বাধ্য হয়ে খুলনার কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন।

এ ছাড়া সিবিএর অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় বাবুলের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশও পাঠানো হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর সচিবালয় শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মনজুর কাদিরের স্বাক্ষরে গত ২৬ জানুয়ারি পাঠানো কারণ দর্শানোর ওই নোটিশে দাবি করা হয়, 'বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বরাবর ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের (সিবিএ) বিরুদ্ধে অভিযোগ সংবলিত চিঠির অনুলিপি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, নৌসচিবের একান্ত সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং শ্রম অধিদপ্তর ঢাকার মহাপরিচালক বরাবর পাঠিয়েছেন বাবুল চন্দ্র ভৌমিক। এরূপ কার্যকলাপ সংস্থার চাকরির শৃঙ্খলাবিধির পরিপন্থি এবং চাকরি প্রবিধানমালা অনুসারে দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণের আওতাভুক্ত।'

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, যে অভিযোগে বাবুলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিও নিয়মবহির্ভূত। কেননা, বিআইডব্লিউটিএর কোনো কর্মচারী সরাসরি চেয়ারম্যান বা সংস্থাটির কোনো সদস্য বরাবর চিঠি লিখতে না পারলেও সাংগঠনিকভাবে কোনো সংগঠনের নেতা এ ধরনের চিঠি লিখতে পারেন বলে প্রচলিত রয়েছে। বাবুল বিআইডব্লিউটিএ ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সদস্য সচিব হিসেবে চিঠিটি লিখেছিলেন। আবার শোকজ নোটিশে চিঠির অনুলিপি নৌপরিবহন ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানোর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অনুলিপি কোথাও পাঠানো হয়নি।

সূত্রমতে, বিআইডব্লিউটিএ সিবিএর মেয়াদোত্তীর্ণ সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম গত বছরের ৭ জুলাই ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ২৩ জনকে নিয়ে সিবিএর সহযোগী কমিটি গঠন করেন, যা বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি। সিবিএ নেতাদের বিশ্বস্ত কয়েকজন ফ্লোটিং কর্মচারীকে নিয়ে গঠিত ওই কমিটির সদস্যরা এর কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন, যেটি বেআইনি ও অবৈধ। অন্যদিকে ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নে ২০১৪ সালের পর আর কোনো নির্বাচন না হওয়ায় নির্বাচন করার লক্ষ্যে গত বছরের ৩ নভেম্বর বিশেষ সাধারণ সভার মাধ্যমে ইউনিয়নটির একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব হিসেবেই বাবুল চন্দ্র ভৌমিক সংস্থার চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়েছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সিবিএ নেতারা প্রভাব খাটিয়ে ও সংস্থার কর্মকর্তাদের দিয়ে বাবুলকে বদলি ও শোকজ করানোসহ নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সিবিএর অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও অনিয়মতান্ত্রিক ও অমানবিক। এতে ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সদস্য ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থার একাধিক কর্মচারী জানান, গত ২১ জানুয়ারি বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের কর্মচারী (সহকারী) ডেইজি খাতুন সংস্থার চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো তার পদোন্নতির আবেদনে একজন সংসদ সদস্যকে দিয়ে সুপারিশ করিয়েছিলেন, যা সংস্থার প্রবিধানমালা ১৯৯০-এর ধারা ৩৪-এর (৩)(৪)(৫) উপ-ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই প্রবিধানমালা অনুযায়ী কোনো কর্মচারী তার চাকরি সম্পর্কিত দাবির সমর্থনে সংস্থার কোনো কর্মকর্তার ওপর রাজনৈতিক বা বাইরের কোনো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন না। অর্থাৎ কোনো কর্মচারীই তার কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য সরাসরি মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য বা অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তির শরণাপন্ন হতে পারেন না। ডেইজি খাতুন এই প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাকে তার চাহিদা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রবিধানমালা লঙ্ঘন না করেও বাবুল চন্দ্র ভৌমিক শাস্তি ও হয়রানির মুখে পড়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন আইনের এমন অপপ্রয়োগে সাধারণ কর্মচারীরাও বিস্মিত হয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর সচিবালয় শাখার অতিরিক্ত পরিচালক মনজুর কাদির সমকালকে বলেন, তিনি বাবুল চন্দ্র ভৌমিককে কোনো শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছেন কিনা, সেটি তার (মনজুর কাদির) মনে নেই। এ সময় তার স্বাক্ষরে পাঠানো শোকজ নোটিশের বিস্তারিত বিবরণ পড়ে শোনানো হলেও বিআইডব্লিউটিএর এই কর্মকর্তা বলেন, 'প্রতিদিন তো কত চিঠিই ইস্যু করি। এ ধরনের চিঠি কাউকে দিয়েছি কিনা আমার খেয়াল নেই। কাজেই এ বিষয়ে কিছু বলতেও পারব না।'

বিআইডব্লিউটিএ ফ্লোটিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সদস্য সচিব বাবুল চন্দ্র ভৌমিক অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতেই সম্মত হননি।