সব বাধা পেরিয়ে অষ্টমবারের মতো শুরু হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় বিতর্ক আসর 'বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব'। ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় সমকাল সভাকক্ষে আয়োজিত এক সভায় উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী ও তাদের মধ্যে যুক্তিবাদী মানস গড়ে দিতে পারে বিজ্ঞানবিষয়ক বিতর্ক, যারা একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলবে। বিজ্ঞানের হাত ধরেই আলোর পথে চলবে তারা। জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব তরুণ সমাজকে সে পথই দেখাচ্ছে। এ উৎসব এখন শুধু বিতর্ক আর প্রতিযোগিতা নয়; প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে কুসংস্কার, হিংসা, কূপমণ্ডূকতা থেকে বেরিয়ে এসে আলোর দিকে। কাঙ্ক্ষিত সে সমাজে রক্ষা পাবে সবার অধিকার। দূর হবে অর্থনৈতিকসহ ধর্ম, গোত্র, লিঙ্গ সব ভেদাভেদ। বিএফএফ-সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ)-এর নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী, সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান, সহযোগী সম্পাদক সবুজ ইউনুস, বার্তা সম্পাদক মশিউর রহমান টিপু, ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ, প্রধান প্রতিবেদক লোটন একরাম, সাবেক কৃতী বিতার্কিক ও বিতর্ক প্রশিক্ষক রাশেদুল ইসলাম পল্লব, সাবেক কৃতী বিতার্কিক ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞ নিশাত সুলতানা, সমকালের অনলাইন বার্তা সম্পাদক গৌতম মণ্ডল, সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন, বিজনেস এডিটর জাকির হোসেন, সুহৃদ সমাবেশ ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তারেক মাহমুদ সজীব, মার্কেটিং ও বিজ্ঞাপন জেনারেল ম্যানেজার মো. ফরিদুল ইসলাম, বিএফএফের প্রোগ্রাম অফিসার মোরশেদ আলম, সিনিয়র সহসম্পাদক হাসান জাকির এবং সহসম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় প্রধান ও সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ।
করোনা মহামারির ফলে গত বছর স্থগিত করতে হয়েছিল উৎসবের অষ্টম আসর। সব সংকট কাটিয়ে নতুন আশায় আবার শুরু হচ্ছে স্কুল বিজ্ঞান বিতর্কের সবচেয়ে বড় এ আসর। 'বিতর্ক মানেই যুক্তি বিজ্ঞানে মুক্তি' স্লোগানে ৬৪ জেলার ৫২০ স্কুল অংশগ্রহণ করবে এ উৎসবে। অংশ নেবে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। তিন পর্বের বিতর্কে জেলা ও বিভাগ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে দেশসেরা ১৬টি দল অংশ নেবে জাতীয় জাতীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত আসরে।
তাই ২০১৩ সাল থেকে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ উৎসবমুখর পরিবেশে এ আয়োজনটি নিয়মিত করে আসছে। করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুষ্ঠিত হবে এবারের উৎসব।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মুস্তাফিজ শফি বলেন, আমরা স্বপ্ন দেখা বন্ধ করব না। আমাদের স্বপ্নই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এই উৎসবের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাই একটি পরিবার হয়ে কাজ করলে সব সংকট মোকাবিলা করে এ উৎসব অন্য আয়োজনকেও ছাড়িয়ে যাবে। গত সাত আয়োজনে প্রায় ১৪ হাজার বিতার্কিক এ আয়োজনে সরাসরি যুক্ত ছিল। জীবনে চলার পথে বিতর্কের মাধ্যমে যে শিক্ষা তারা অর্জন করেছে, তা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমরা সৃজনশীল সব আয়োজনের পাশে আছি। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা ও প্রসারের আমাদের আয়োজনগুলো ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করছি। এত বড় একটি আয়োজন ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে নেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সবার আন্তরিকতায় এটি সম্ভব হয়েছে। নতুন নতুন বিষয় ও প্রান্তিক স্কুলগুলোকে এ আয়োজনে যুক্ত করতে চাই। বিএফএফ ও সমকাল সুহৃদ সমাবেশ এবং সংশ্নিষ্ট সবার প্রচেষ্টায় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব বিস্তার লাভ ও শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে আরও আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।
আবু সাঈদ খান বলেন, করোনা আক্রান্ত পৃথিবী বুঝতে সক্ষম হয়েছে, বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা কতটা জরুরি। মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়ে সঙ্গে বিতর্ক বিষয়ক লেখালেখি যুক্ত করা যেতে পারে। বিতর্ক সাহিত্য গড়ে তোলা যায় কিনা, তাও দেখা প্রয়োজন। বিজ্ঞান বিতর্কসহ আমাদের সব আবেদন ও প্রচেষ্টা মানবিক উন্নয়নে কাজে লাগতে হবে।
সবুজ ইউনুস বলেন, নিয়মিত এই আয়োজন করতে পারায় ধারাবাহিক একটা অগ্রগতি আমরা লক্ষ্য করছি। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অন্য ভিডিওর চেয়ে শিক্ষামূলক এ আয়োজনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
মশিউর রহমান টিপু বলেন, প্রান্তিক ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক গ্যাপ রয়েছে। এই সংকট কীভাবে উত্তরণ করা যায়, এ নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের ভালো গাইড প্রয়োজন। তাদের মেধার বিকাশে আমাদের কাজ করতে হবে।
মাহবুব আজীজ বলেন, জীবন-মৃত্যুর মাঝ থেকে আমরা নতুন এক সময়ে অবস্থান করছি। সব বাধা পেরিয়ে আমরা নতুন করে এগিয়ে যাব। এটি এমন একটি আয়োজন, যা ধারাবাহিকভাবে করে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ, যা আমরা করতে সক্ষম হচ্ছি। একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক, যুক্তিনিষ্ঠ বাংলাদেশ গড়তে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিজ্ঞান বিতর্ক অত্যন্ত জরুরি।
রাশেদুল ইসলাম পল্লব বলেন, এই উৎসব বাংলাদেশে বিতর্ক চর্চার আবহ বদলে দিতে কাজ করছে। নানা সময় শিক্ষার্থীদের কাজ থেকে চমৎকার প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। মুখস্থ করার প্রবণতা ও প্রস্তুতি না নিয়ে বিতর্ক করা থেকে বিরত থেকে সঠিক নিয়মে বিতর্ক করতে হবে।
নিশাত সুলতানা বলেন, এ আয়োজনে বিজ্ঞানকে মানবিক সমাজ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধারা হয়, এটা আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। জেন্ডার সংবেদনশীলতায় ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিতার্কিকরা সঠিক শব্দ চয়ন করবে, আবেগ ও যুক্তির মেলবন্ধনে তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেবে সঠিক বার্তা।
লোটন একরাম বলেন, বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কোথায়, তা বের করতে হবে। প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক সব আয়োজনে যুক্ত করতে হবে।
২০১৩ সাল থেকে নিয়মিত এ বিতর্ক উৎসব আয়োজিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিযোগিতা শুরু হবে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। জেলা পর্যায়ের বিতর্ক চলবে ৫ মার্চ পর্যন্ত। ১২ এপ্রিল থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বিভাগ পর্যায়ের উৎসব। ৯ ও ১০ এপ্রিল ঢাকায় দু'দিনের চূড়ান্ত আসরের মধ্য দিয়ে এ বছরের মতো বিতর্ক উৎসবের পর্দা নামবে। সমকাল সুহৃদ সমাবেশ বা জেলা প্রতিনিধির মাধ্যমে যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করে বিএফএফ-সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবে যোগ দিতে পারবে।

বিষয় : বিজ্ঞানের হাত ধরেই তরুণ প্রজন্ম চলবে আলোর পথে

মন্তব্য করুন