মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা বলেছেন, জঙ্গিবাদের উত্থান ও শেকড়কে উপক্ষো করে শুধু জঙ্গিবাদীদের মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন সৈনিকের দণ্ড দেওয়াটা অভিজিৎ হত্যা কিংবা অন্য ব্লগার, প্রকাশক ও সমকামীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার নয়।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে এ কথা বলেন তিনি।

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান অভিজিৎ হত্যা মামলার পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এছাড়া, এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। 

বন্যা লিখেছেন, রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে দেশের অনেক সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিলেন। তাদের সেই অনুরোধ না রাখতে পেরে দুঃখিত। এর পরিবর্তে তিনি ফেসবুকে ওই স্ট্যাটাস দেন। ইংরেজিতে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ছয় বছরের বিভ্রান্তি ও বিলম্বের পরে আমরা আজ রায় পেয়েছি। ২০১৫ সালে আমার প্রয়াত স্বামী অভিজিৎ রায় (অভি) এবং আমি আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা বাৎসরিক বইমেলায় অংশ নিয়েছিলাম, যেখানে অভির দু'টি বই প্রকাশ হয়েছিল। সে সময় আমাদের ওপর ইসলামপন্থী জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করেছিল। অভি নিহত হয় এবং আমি কোনো রকমে বেঁচে যাই। সেদিনের বিভীষিকা আরও প্রায় এক বছর আমাকে স্বাভাবিক হতে দেয়নি। আজ আদালত তাদের রায় প্রকাশ করেছেন। হামলাকারীরা বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্ম সম্পর্কিত বই ও ব্লগে লেখার জন্য অভিজিৎকে হত্যা করেছিল, যেটার বিচার করা হয়েছে। এই রায়টি আমার বা আমাদের পরিবারের জন্য শেষ কথা নয়। 

বন্যা লিখেছেন, গত ছয় বছরে এ হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কেউই আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেননি। অথচ আমি এ হামলার প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিজেও হামলার শিকার হয়েছিলাম। গত জানুয়ারিতে মামলার সরকার পক্ষের আইনজীবী প্রকাশ্যে মিথ্যাচার করে বলছেন যে, আমি নাকি এ মামলায় সাক্ষী হতে চাইনি। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্রপক্ষের কেউই কখনও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। রায় সম্পর্কে বলতে চাই, রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রধান দু'জন জঙ্গিগোষ্ঠীর শীর্ষ কমান্ডার সৈয়দ জিয়াউল হক এবং শীর্ষ জঙ্গি আকরাম হোসেন ধরা পড়েনি। ২০১৫ সালে অভির প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার রায়ে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, জিয়াউল হক আট মাস ধরে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক এবং প্রকাশকদের একের পর এক হত্যার জন্য পরিকল্পনা চালিয়ে গেছে। তারপর অভি ও আমি হামলার শিকার হই। অথচ বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হয়েছে।

অভিজিতের স্ত্রী আরও লিখেছেন, আজকের দিনে কোনো সভ্য দেশই বিনাবিচারে হত্যা মেনে নিতে পারে না। কিন্তু ২০১৬ সালে আমাদের ওপর হামলাকারীদের অন্যতম মুকুল রানা শরীফ পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড- যা বাংলাদেশের সাধারণভাবে 'ক্রসফায়ার' নামে পরিচিত- তার শিকার হন। এর কয়েক মাস আগে থেকেই শরীফ পুলিশ হেফাজতে ছিল। তাহলে তাকে কেন হত্যা করা হয়েছিল?

গত সপ্তাহে দীপন হত্যা মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত হত্যাকারীদের একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে যে, ২০১৫ সালে মুক্তচিন্তার বইয়ের প্রকাশক, ব্লগার ও সমকামীদের হত্যার জন্য অর্থের যোগান আসত। আমি জানতে চাই, এই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো তদন্ত হয়েছে? কেউ কি এই তদন্ত করেছেন? এই রায়গুলো আমাদের সত্যিই কি কোনো সুফল দেবে যদি তাদের অর্থের উৎস কিংবা শক্তির উৎস চিহ্নিত না করা যায়? 

বন্যা আরও লিখেছেন, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অভি এবং আমাকে বিজ্ঞানমনষ্ক একদল লেখকের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যারা এই আয়োজন করেছিল তারা আমাদের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষায় রেখেছিল। তারপর সন্ধ্যায় ওই দলটির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। এই ইভেন্টের পরই অভি এবং আমি হামলার শিকার হই। সেই ইভেন্টের আয়োজকদের বিষয়ে কি কোনো তদন্ত হয়েছে? সেই তদন্তের ফল কি?

জঙ্গিবাদের উত্থান ও শেকড়কে উপক্ষো করে শুধু জঙ্গিবাদীদের মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন সৈনিকের দণ্ড দেওয়াটা অভিজিৎ হত্যা কিংবা অন্যান্য ব্লগার, প্রকাশক ও সমকামীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের 'প্রকৃত বিচার' নয় বলে উল্লেখ করেন বন্যা। 

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টিএসসির সামনে অভিজিৎ ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান অভিজিৎ। ওই ঘটনায় তার বাবা অধ্যাপক অজয় রায় পরদিন শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন।