প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারভিত্তিক আইন ও বিধি অনুযায়ী জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ স্থানে এসব কমিটি অচল হয়ে আছে। আইনে তাদের অধিকারের বিষয় থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। ফলে প্রতিবন্ধীরা সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। তাদের উন্নয়নে দরকার জাতীয় নীতিমালা, কর্মপরিকল্পনা, আইন ও বিধি বাস্তবায়ন এবং কমিটি কার্যকর করতে গতি বাড়ানো।
প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক এক অনলাইন গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষাবিষয়ক কমিটির কার্যকারিতা, চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়' শিরোনামে বৈঠকটির আয়োজন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় যৌথভাবে এর আয়োজন করে সমকাল, ইংরেজি দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ, জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থা ও এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
বৈঠকে আলোচকরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ে গঠিত কমিটি সক্রিয় করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধীবিষয়ক কাজের জন্য আলাদা পদ তৈরি, প্রতিবন্ধী শনাক্তে স্বাস্থ্য বিভাগের স্বচ্ছতা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান।
বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, আমরা এ মুহূর্তে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে। এ সময়ে প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ গঠন না হলে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে কাজ করতে হবে। দৈনিক সমকাল দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে কাজ করছে। সমকাল শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করতে চায় না, সমাজের জন্যও কিছু কাজ করছে। সেই জায়গা থেকে আমরা প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। বৈঠকে এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর শফিকুল ইসলাম বলেন, এডিডি ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় তিন বছর ধরে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় আমরা চেষ্টা করেছি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে যেসব জেলা, উপজেলা ও শহর কমিটি করা হয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় প্রতিবন্ধীদের মাঝে সচেতনতাও তৈরি করা হচ্ছে।
তিনটি জেলার প্রায় ১২টি উপজেলায় এডিডি কাজ করছে বলে জানান শফিকুল ইসলাম। সাড়ে চার হাজার প্রতিবন্ধী এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবানী ভট্টাচার্য বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় আইনের মাধ্যমে চারটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির মিটিংয়ে কী হবে, তা আইনে বলে দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বছরে তিন মাস পর পর চারটি মিটিং হওয়ার কথা। অথচ আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে, এসব মিটিং নিয়মিত হচ্ছে না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মমুখী করতে মিটিংয়ে কিছু হয় না। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নয়, ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজ প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন করা।
শিবানী ভট্টাচার্য জানান, ২১১টি সেবাকেন্দ্র প্রক্রিয়াধীন আছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠনের জন্য জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধীবান্ধব ভবন তৈরির জন্য গণপূর্ত বিভাগকে বলা হয়েছে।
ডেলিগেশন অব ইউরোপীয় ইউনিয়ন টু বাংলাদেশ-এর টিম লিডার-গভর্ন্যান্স আমায়া জাবালা বলেন, প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার আগের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের মূলধারায় আনতে হলে দরকার সম্মিলিত প্রয়াস। এক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটিকেও এগিয়ে আসতে হবে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধে এডিডির প্রকল্প প্রধান গোলাম ফারুক হামিম বলেন, আমাদের কর্ম এলাকার থানাগুলোতে এখন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় কমিটির মিটিংগুলো নিয়মিত হচ্ছে। সফলতার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু সমস্যাও হচ্ছে। ইউএনও ও জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে অনেক কমিটির সভাপতি, ফলে কমিটির কিছু মিটিং তাদের কারণে দেরিতে শুরু হয়।
সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবেলিটির (সিএসআইডি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, প্রতিবন্ধীবিষয়ক অধিকার ও সুরক্ষা আইন ১২ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণে তৈরি হয়েছে। আইনে কোনো ফাঁক নেই। তবে সারাদেশে ১২ থেকে ১৩শ কমিটি আছে। এই কমিটিগুলো যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করত তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন পাল্টে যেত।
প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদের সভাপতি নাসিমা আক্তার বলেন, মিটিং করার জন্য প্রশাসনের লোকরা সময় দিতে চায় না। মিটিংগুলো দোতলা-তিনতলায় হওয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ওপরে উঠতে পারেন না। মিটিংয়ের বিষয়ে সরকারের কোনো মনিটরিং নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। প্রতিবন্ধী ভাতার মধ্যেই তাদের সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। তাদের কর্মমুখী করার উদ্যোগ নেই।
বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু সাঈদ মো. কাউসার রহমান বলেন, অধিকাংশ হাসপাতালে প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা ব্যস্ত থাকেন। এতে সমস্যা হচ্ছে। আবার প্রতিবন্ধী ভাতা ঘোষণার পর সুস্থ লোকও প্রতিবন্ধী হতে চাচ্ছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রবণতা কম। তারা ভাতা নিতেই বেশি আগ্রহী।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজরানা ইয়াসমিন হীরা বলেন, ভাতার জন্য ফরম পূরণ করতে দোকানে ২০০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু এই টাকাও অনেকের দেওয়ার ক্ষমতা নেই। প্রতিবন্ধী ভাতা প্রক্রিয়া আরও সহজ করা দরকার।
জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থার সভাপতি সুশান্ত কুমার দাশ বলেন, প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন সাত বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। জনপ্রতিনিধিদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। সামনে গণশুমারিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে, তাহলে সঠিক সংখ্যা বের হয়ে আসবে।
সেন্টার ফর ডিসঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) নির্বাহী পরিচালক এএইচএম নোমান খান বলেন, ২০০১ সালের আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণের কথা থাকলেও অধিকারের কথা ছিল না। ২০১৩ সালের আইনে অধিকারের কথা আছে। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা এখনও হয়নি।
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন্নাহার মিষ্টি বলেন, সব প্রতিবন্ধীর ভাতার প্রয়োজন নেই। তাদের মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। সামাজিক সব কাজে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
পটুয়াখালী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সীলা রানী দাস বলেন, জেলা পর্যায়ের কমিটির মিটিংয়ের উপজেলা কমিটির লোকজনকে রাখা উচিত। তাহলে অনেক সমস্যা উঠে আসবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য প্রতিবন্ধীবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
বগুড়া শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, বগুড়ায় চার হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন। আমরা অনেককে স্বনির্ভর করার চেষ্টা করছি।
রংপুরের সমাজসেবা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, তার এলাকায় অনেক সমস্যার মাঝেও জেলা ও উপজেলা কমিটির মিটিংগুলো নিয়মিত হয়। তবে করোনার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
সবাই সচেতন হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের কমিটিগুলো সচল হবে বলে মনে করেন গলাচিপা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ওয়ালি উল ইসলাম।