দেশের সম্ভাবনাময় ফসল আলু। চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর প্রচুর উদ্বৃত্ত থাকলেও এ থেকে কৃষক ও দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। কারণ, বাণিজ্যিকভাবে দেশে আলুর বহুমুখী ব্যবহার নেই; অন্যদিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ধরনের আলুর চাহিদা রয়েছে, সেটির উৎপাদন এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। এতে আলুর বাম্পার ফলন কৃষকদের কাছে কখনও কখনও একসময়ের পাটের মতো 'গলার ফাঁস' হয়ে দেখা দেয় দাম না পাওয়ায়। গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আলুর দাম বাড়লেও এখন আবার কমতির দিকে। এবার কৃষক পর্যায়ে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে চার লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে এক কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা গত বছরের প্রকৃত উৎপাদনের চেয়ে প্রায় সাড়ে  চার লাখ টন বেশি। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ৯ লাখ ১৭ হাজার টন। অধিদপ্তরের হিসাবমতে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা মাত্র ৭৭ লাখ টন। অর্থাৎ, বছরে ২৬ থেকে ৩৭ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। বছরে রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ সমকালকে জানান, গত বছর তারা আলুর উৎপাদন খরচ ঠিক করেছিলেন কেজিপ্রতি ৮ দশমিক ৩২ টাকা এবং পরে বাজারে বিক্রির জন্য গড় দাম ২১-২২ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তার পরও প্রতিবছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে উৎপাদন মৌসুমে আলুর দরপতন ঘটে। তিনি বলেন, যে হারে আলুর উৎপাদন বাড়ছে, সে অনুযায়ী এর বহুমুখী ব্যবহার ও রপ্তানির ব্যবস্থা না হলে কৃষককে বিপাকে পড়তে হয়।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, কৃষকের দুঃখ দূর করতে তারা রপ্তানি ও শিল্পে ব্যবহারযোগ্য এবং আগাম জাতের আলু চাষে জোর দিচ্ছে। এ জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি ৫৯৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নীলফামারীর ডোমারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) খামারে আগাম জাতের, উচ্চ ফলনশীল, রপ্তানি ও শিল্পে ব্যবহার উপযোগী আলু এবং আলুবীজের চাষ হচ্ছে। এ খামারে ৫১৬ একর জমির মধ্যে আলু চাষের উপযোগী ৩১০ একর। চলতি ২০২০-২১ উৎপাদন বর্ষে ২৫৬ একর জমিতে বীজ আলু উৎপাদন হয়েছে।
বাড়তি উৎপাদন :গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারিতে আলু বিক্রি হচ্ছে ১০-১২ টাকা এবং খুচরায় ১৪-১৬ টাকা। মাঠ পর্যায়ে কৃষক দাম পাচ্ছেন প্রতি কেজি ৮-৯ টাকা। তবে মাঝেমধ্যে এই দাম কিছুটা ওঠানামা করে। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় এত আলু উৎপাদনের পরও কৃষকের মধ্যে হাহাকার চলছে।
রপ্তানিমুখী ও শিল্পনির্ভর জাত, উন্নত জাতের আলুর বীজের সংকট, আলুর রোগ, পর্যাপ্ত অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি না থাকা, পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও কৃষিজ্ঞানের অভাবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আলু রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। অন্যদিকে, চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন ও সংরক্ষণাগারের অভাবে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক।
বেশ কয়েকজন কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, এ মৌসুমে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৮-৯ টাকা। কৃষক পর্যায়ে এর নিচে দাম নামলে লোকসান হবে চাষিদের।
বগুড়ার শিবগঞ্জের কৃষক আজিজুল হক সমকালকে বলেছেন, কিছুদিন আগে আলু ২৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন সাত-আট টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ আলু মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। আর কিছুদিন পর এক কেজি আলু চার টাকায়ও নেবেন না ব্যাপারিরা। হুজুগে সবাই এবার আলুচাষ করলেও কোল্ডস্টোরে রেখে জমি বেচে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।
বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক (আলুবীজ) আবির হোসেন সমকালকে বলেন, রপ্তানি এবং শিল্পে ব্যবহার উপযোগী গুণাবলি না থাকায় আলুর বহুমুখী ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে চাষি যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে বিশাল রপ্তানি ও শিল্পবাজার হারাচ্ছে দেশ। কিছু সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, আলু ক্ষেত থেকে তোলার পর পরিস্কারের জন্য বাংলাদেশের কোথাও ওয়াশিং মেশিন নেই। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও আলু নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। রোগমুক্ত আলু উৎপাদনের জন্য পদ্ধতি জানা নেই কৃষকের। সরকারের পাশাপাশি যারা ব্যবসা করছেন, তাদেরও এ বিষয়গুলো দেখতে হবে।
২০০৭ সালে 'বেশি করে আলু খান ভাতের ওপর চাপ কমান' স্লোগানে সরকার খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার বাড়াতে নানা প্রচার কার্যক্রম হাতে নেয়। কিন্তু সেই প্রচারণা বেশিদিন টেকেনি। অথচ পৃথিবীর ৪০টির বেশি দেশে আলু প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। আলু থেকে প্রস্তুত মুখরোচক খাদ্য বহুমূল্যে বিক্রি হয় বিদেশে। অথচ বাংলাদেশে আলুর তেমন বহুমুখী ব্যবহার নেই। উদ্বৃত্ত আলু কাজে লাগাতে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম, রেশনিং, ভিজিএফ কার্ড ও কাবিখা কর্মসূচিতে চাল কমিয়ে আলুর পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রপ্তানিতে বাধা :এডিবির এক গবেষণায় বলা হয়, শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বছরে গড়ে চার কোটি ১০ লাখ ডলারের আলু আমদানি হয়। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে আলু রপ্তানি করে আয় করে আট লাখ ডলার। মোট উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ আলু রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। ফলে বেশিরভাগ আলুর গুণগত মান ঠিক থাকে না।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বিমল চন্দ্র কুণ্ডু বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল বিদেশি আলুর জাত আছে প্রায় ৮০টি। তবে বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আলুচাষের প্রবণতা কম।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বাংলাদেশে আলুতে পানি থাকে ৮০-৮২ শতাংশ। ইউরোপের দেশগুলোতে আলুতে পানির পরিমাণ সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। এ ছাড়া ইউরোপের বাজারের সঙ্গে আমাদের আলু তোলার টাইমিং ঠিক নেই। এ জন্য আগাম চাষ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আমরা অনেকগুলো জাত এনেছি, যেগুলোতে পানি থাকবে ২০ শতাংশেরও কম। এ জাত জনপ্রিয় করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজার আমাদের হাতে থাকবে। রপ্তানিও সহজ হবে।
ধরন পাল্টাতে হবে :বিএডিসির 'মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণ জোরদারকরণ' প্রকল্পের আওতায় ডোমারে ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন জাতের উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য ট্রায়াল প্লট স্থাপন ও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ২৮টি জোনে চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে বীজ আলু উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বারি উদ্ভাবিত মিউজিকা, সাগিতা, জার্মানি থেকে আনা আগাম জাত সানশাইন, প্রাডা, কুইন অ্যানি, ডোনাটা, সানতানা, লাবেলাসহ বেশকিছু জাত।
বিএডিসির চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম বলেন, অতীতে আমরা বিদেশ থেকে বীজ আমদানি করতাম। বর্তমানে বিএডিসি জৈবপ্রযুক্তি তথা টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে বীজ আলুর উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করে। টিস্যু কালচার এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে গাছের অতি সূক্ষ্ণ মেরিস্ট্রম নিয়ে তা থেকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রোগমুক্ত চারা তৈরি হয়। তিনি জানান, গত বছর বিএডিসি আমদানীকৃত ১৯ জাতের মধ্য থেকে ট্রায়ালের মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য ও শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী ১০টি জাত নির্বাচন করে। এ বছর সারাদেশে ৩০০টি প্রদর্শনী প্লট ও মাল্টিলোকেশন টেস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২০-২১ উৎপাদন বর্ষে বিভিন্ন মানের ৩৭ হাজার ৫০০ টন বীজ আলু এবং পাঁচ হাজার টন রপ্তানি উপযোগী আলুসহ সর্বমোট ৪২ হাজার ৫০০ টন আলু উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যন্ত্রের ব্যবহার ও কৃষকদের প্রশিক্ষণও চলছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে সারাদেশে ২৮টি জোনের ৩০টি হিমাগার রয়েছে, যার বর্তমান ধারণক্ষমতা মোট ৪৫ হাজার ৫০০ টন। এ প্রকল্পের মেয়াদে দুই হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন চারটি হিমাগার নির্মাণ করা হবে। ফলে বিএডিসির বীজ আলুর সংরক্ষণক্ষমতা উন্নীত হবে ৫৩ হাজার ৫০০ টনে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে বীজ আলু উৎপাদন ৬০ হাজার টনে উন্নীত করা হবে।
বিএডিসি ডোমার প্রকল্পের ডেপুটি পরিচালক আবু তালেক মিয়া বলেন, তাদের ভিত্তিমূলক বীজ আলু খামার থেকে প্রায় ৫০০ টন বীজ পাওয়া যাবে।

বিষয় : আলু কেন চাষির গলার ফাঁস

মন্তব্য করুন