উন্নয়ন প্রকল্পে পরিচালক (পিডি) নিয়োগে উভয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পে পিডি নিয়োগ না করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। গতকাল সোমবার সময়সীমা পার হলেও প্রকল্পের তুলনায় কর্মকর্তার সংখ্যা কম হওয়ায় সমাধানের পথ বেরোয়নি। বিকল্প হিসেবে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রেষণে পিডি নিয়োগের প্রস্তাবে নাখোশ প্রকৌশলীরা।

সরকারি নিয়মে, একাধিক প্রকল্পে এক কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগের সুযোগ নেই। ২০০৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের ১৬(৩৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগ করতে হবে। ১৬(৩৭) অনুচ্ছেদে বলা হয়, এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।

এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় উদ্যোগী হয়ে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে চিঠি দেয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোকে। এতে বলা হয়েছিল, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা ১৪ প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দু'জন কর্মকর্তা ১৩টি করে প্রকল্পে এবং পাঁচজন কর্মকর্তা ১০ বা ততোধিক প্রকল্পে পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগে (এলজিইডি) ১৪ জন কর্মকর্তা তিন থেকে ছয়টি প্রকল্পের পিডি। ৩৮ জন কর্মকর্তা দুই বা ততোধিক প্রকল্পের পিডি। একই অবস্থা বিদ্যুৎ, রেল, গণপূর্ত ও পানি মন্ত্রণালয়ে। এ অবস্থাকে 'ভয়াবহ' বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

'এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পে পিডি নিয়োগ পরিহারে' গত ৭ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) আবদুল মালেকের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর দিন আবদুল মালেক সমকালকে বলেছিলেন, সমস্যা চিহ্নিত করতেই বৈঠক করেছেন।

সভায় বলা হয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সওজ ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২০১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে ২১টি প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কম। সরকারি নিয়মে বাকি ১৮০টি প্রকল্পে নিয়মিত পিডি প্রয়োজন। সভায় বলা হয়, সওজে পিডি হওয়ার যোগ্য অনুমোদিত কর্মকর্তার পদের সংখ্যা ১৫৪। কিন্তু নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন ৭৯ জন। ঊর্ধ্বতন পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন ৭৫ জন। প্রকল্পে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন ৯১ জন। সব মিলিয়ে ২৩৫ জনের মধ্যে ৫১ জন প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। তাদের পিডি নিয়োগ করার সুযোগ নেই। আবার অনেক কর্মকর্তা ডিটিসিএ, রাজউক এবং সেনাবাহিনীর প্রকল্পে প্রেষণে রয়েছেন। ফলে প্রকল্পের তুলনায় কর্মকর্তার সংখ্যা আরও কমেছে।

সভায় বলা হয়, একটি সড়ক, মহাসড়ক একাধিক জোন ও সার্কেলে বিস্তৃত। একাধিক সার্কেলে বিস্তৃত সড়কের প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকেই পিডির দায়িত্ব দিতে হয়। একাধিক বিভাগের বিস্তৃত সড়কের প্রকল্পে পিডি করতে হয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে। এ কারণেই এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করতে হয়। জেলা পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলীরা দায়িত্ব পালন করেন। তারা প্রকল্পের বিলে সই করেন। কোনো জেলায় একাধিক প্রকল্প চলমান থাকলে, তাই একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী সেখানে নিয়োগ সম্ভব হয় না। আবার মেগা প্রকল্প বাদে অন্য প্রকল্পে নিজস্ব জনবল কাঠামো নেই। তাই সওজের নিয়মিত জনবলকে সেখানে দায়িত্ব পালন করতে হয়।

সভা থেকে সুপারিশ করা হয়েছে, ছোট ছোট প্রকল্পকে একীভূত করে প্রকল্প সংখ্যা ১০০-তে সীমাবদ্ধ রাখার। ৩০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে নিয়মিত পিডি নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি দুটি প্রস্তাব হলো- অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের পিডি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে 'প্রকৌশলগত জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন' কর্তকর্তাদের প্রেষণে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ। অতিরিক্ত ও উপ-প্রকল্প পরিচালক পদে প্রকৌশলীদের নিয়োগ করা হবে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সভার প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত থেকে একই ধরনের প্রস্তাব গিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এসব প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীরা। জনপ্রশাসন থেকে প্রেষণে পিডি নিয়োগের ভাবনার সংবাদ সমকালে প্রকাশিত হওয়ার পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন জরুরি বর্ধিত সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রশাসন থেকে পিডি নিয়োগ না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গণপূর্ত ভবনে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়েছে প্রশাসন থেকে পিডি নিয়োগের প্রস্তাবের প্রতিবাদে।

সওজের প্রকৌশলী সমিতির একাধিক নেতা বলেছেন, তারা পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চেয়ে পিছিয়ে। তাদের পিডি নিয়োগ করা হলে প্রকৌশলীদের প্রতি বঞ্চনা আরও বাড়বে।

সওজের একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, 'প্রকৌশলগত জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন' প্রশাসনের কর্মকর্তা বলতে মন্ত্রণালয় কী বোঝাচ্ছে- তা পরিস্কার নয়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রকৌশলগত জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন নন। তাদের তাত্ত্বিক শিক্ষা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কাজের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নেই। অনেকেই মেডিকেল থেকে পাস করে অন্য চাকরিতে গিয়েছেন। চিকিৎসক স্বল্পতা কাটাতে তাদের কী হাসাপাতালে প্রেষণে নিয়োগ করা হবে!