নিজেকে তিনি পরিচয় দিতেন 'বনবন্ধু' হিসেবে। বনায়নের ব্যাপারে নাকি তার অনেক আগ্রহ। মুজিববর্ষে বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগানোর জন্য উদ্যোগও নিয়েছিলেন। এ জন্য ৪০ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা চেয়ে চিঠিও দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এসবই ছিল তার প্রতারণার কৌশল। প্রধানমন্ত্রীর বাণী ও মুজিববর্ষের লোগো সংবলিত চিঠি পাঠিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। ৭০ বছর বয়সী এই ব্যক্তির নাম জাহিদুর রহমান ইকবাল। মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের শাহ আলী ভবনের নিজ অফিস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই প্রতারকের গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারায়।
ইকবালকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপ-কমিশনার হারুন-অর-রশীদ বলেন, ৩০ বছর ধরে কারওয়ানবাজার এলাকায় নানা কৌশলে প্রতারণা করে আসছিলেন ইকবাল। মুজিববর্ষের লোগো ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী ব্যবহার করাই এখন তার প্রতারণার মূল উপাদান। নিজেকে তিনি 'বনবন্ধু জাহিদুর ট্রি প্লান্টেশন' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করেন। মুজিববর্ষে গাছ লাগানোর কথা বলে তিনি অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। অবৈধভাবে তৈরি সিল ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। কনসালট্যান্ট গ্রুপ লিমিটেড, এসএমই কনসালট্যান্ট লিমিটেড ও ইইএফ কনসালট্যান্ট লিমিটেড নামে তিনটি অবৈধ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন। তবে তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া ইকবাল বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম ভাঙিয়ে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও বহু মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ইকবালের বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের অভিযানের সময়ও তিনি প্রতারণার চেষ্টা চালান। তিনি দাবি করেন, পুলিশ ব্যাংকেও তিনি বিনা পয়সায় কন্সালট্যান্সি ফার্ম করে দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে ২৭০টি সিল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৮৪টি নথিপত্রের ফাইল, মুজিববর্ষের লোগো ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী সংবলিত ৫০০টি চিঠি, দুটি সিপিইউ, দুটি প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার, দুটি মনিটর, একটি ল্যাপটপ, দুটি মোবাইল ফোন ও একটি টয়োটা করোলা গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, ব্যক্তিগত গাড়িতে জাতির পিতার ছবি ব্যবহার করে ইকবাল প্রতারণামূলক কর্মকা করে আসছিলেন, যা বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার শামিল। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও আয়করের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন। ১০-১২টি ভুয়া ও নামসর্বস্ব কনসালট্যান্সি ফার্মের চেয়ারম্যান ও সিইও হিসেবে ফিন্যান্সিয়াল কন্সালট্যান্সি কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন, ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ অনুমোদন, ডকুমেন্ট প্রসেসিং, ব্যাংক-বীমার অনুমোদন, টিআইএন সার্টিফিকেট, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, ফায়ার লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্স প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মাসাৎ করেন তিনি।
পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ইকবালের প্রতারণার ব্যাপারে অন্তত ৫০০ জন মৌখিক অভিযোগ করেছেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তার প্রতারণার আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


মন্তব্য করুন