ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সদস্যরা গতকাল রোববার ওই কারাগারটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য নেন। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক ও কারা কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটিও পৃথকভাবে কাজ করছে। মুশতাকের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কমিটির সদস্যরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করবেন। তবে সুরতহাল প্রতিবেদনে মুশতাকের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও তার রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার গিয়াস উদ্দিন সমকালকে বলেন, মুশতাক কারাগারে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিকভাবে তাকে জেলখানার ডাক্তার দেখেন। তার পরামর্শে দ্রুত মুশতাককে তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কারাগারের অপর একজন কর্মকর্তা জানান, মুশতাককে সেখানে নেওয়ার পর কখনও অসুস্থতার কথা তাদের জানাননি। শুধু মাথাব্যথার জন্য একবার কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট নিয়েছেন। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন মুশতাক।

মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তরুণ কান্তি শিকদারকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। চার কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মুশতাকের মৃত্যুর কারণ জানতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে গাজীপুরের জেলা প্রশাসন। এর আগে এই ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ একজন সিনিয়র জেল সুপারকে প্রধান করে পৃথক আরেকটি কমিটি গঠন করে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

তদন্ত কমিটি যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তার মধ্যে রয়েছে- মুশতাকের মৃত্যুতে কারা কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার গাফিলতি ছিল কিনা? যদি থাকে তাহলে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা। তাকে কারাগারে নেওয়ার পর তার কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ অবহিত ছিল কিনা? যদি থাকে তাহলে সেই বিষয়ে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা? যদি না হয়ে থাকে তাহলে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা।

প্রাথমিক প্রতিবেদন: মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় আদালতে প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এই প্রতিবেদন দাখিল করেন কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার গিয়াস উদ্দিন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২০ সালের ৬ মে ঢাকা সিএমএম আদালত থেকে সরাসরি মুশতাককে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৪ আগস্ট অবস্থানের জন্য কারাগারে বদলি (কাশিমপুর কারাগারে) পাওয়া যায়। গত বৃহস্পতিবার 'সাডেন আনকনশাসনেস'-এর (হঠাৎ অচেতন হওয়া) কারণে কারা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ৭টা ২০ মিনিটে জরুরিভিত্তিতে তাকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মুশতাককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রাত ৮টা ২০ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন। পরের দিন ১২টা ২৫ মিনিটে মৃতদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মুশতাকের চাচাতো ভাই নাফিসুর রহমানের আবেদেনের পরিপ্রেক্ষিতে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়।

মুশতাকের চিঠি ভাইরাল: কারাগারে থাকাকালে মুশতাক তার পরিবারের কাছে সাত-আটটি চিঠি লেখেন। এর মধ্যে একটি চিঠি ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। স্ত্রী লিপা আক্তারকে লেখা চিঠির একটি অংশে মুশতাক লেখেন- 'আমাদের নামে যেই মামলা হোক, মহাদেব সাহার কবিতার কয়েকটি লাইন মনে রাখবা।' এরপর তিনি কয়েকটি পঙ্‌ক্তি চিঠিতে লেখেন। তা হলো- 'কোকিলও কি দেশদ্রোহী যদি সে আপন মনে কারও নাম ধরে ডাকে?/ বকুলও দণ্ডিত হবে যদি কিনা সেও কোনো নিষিদ্ধ কবরে একা নিরিবিলি ঝরে/ আর এই আকাশও যদি বা তাকে অকাতরে দেয় স্নিগ্ধ ছায়া/ তাহলে কি আকাশের দেশপ্রেম নিয়ে কেউ কটাক্ষ করবে অবশেষে?'