এটা আমার পরম সৌভাগ্য যে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমি জীবিত রয়েছি। আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশ ব্রিটেনের অধীনে ছিল প্রায় ২০০ বছর। দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ধর্ম ও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দুটি দেশ পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হলো। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুটি অংশ। একটি পূর্ব পাকিস্তান ও আরেকটি পশ্চিম পাকিস্তান। যাদের ভেতরে দূরত্ব ছিল ১২০০ মাইল। মাঝখানে ভারত। এ দুটি অঞ্চলের জনগণের মধ্যে না খাদ্যে, না পোশাকে, না সংস্কৃতিতে- কোনো কিছুতেই মিল ছিল না। শুধু ছিল অধিকাংশ জনগণের মধ্যে ধর্মের মিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো রাষ্ট্রের জন্ম এবং টিকে থাকা সম্ভব নয় বলেই পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জন্ম। সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের ৫৬ শতাংশই ছিলাম আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। যখন রাষ্ট্রভাষা নিয়ে প্রশ্ন উঠল, তখন ৫৬ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত চলল। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। আমরা ৫৬ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানালাম।
রাষ্ট্রভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোজগতে একটা বিরাট প্রশ্ন দেখা দিল। আমরা দেখলাম পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে শাসন-শোষণ ও অত্যাচার শুরু করল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পাট বিদেশে রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাকিস্তান আহরণ করত, তা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় না করে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পকারখানা উন্নয়নে ব্যয় করতে লাগল। এর ভেতর দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের পাকিস্তানের প্রতি মোহমুক্তি ঘটতে শুরু করল। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ জনগণ নানা আন্দোলন শুরু করল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলো।
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের বাঙালি জাতিসত্তার অনুসন্ধান শুরু করল। পরে ১৯৬২ সালে শরিফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে জনগণ ও এ দেশের ছাত্রসমাজ রুখে দাঁড়াল। আমি তখন ইডেন গার্লস কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। ছাত্রদের ডাকা হরতালে কলেজের গেটে বড় তালা লাগিয়ে দেওয়া হতো। মতিয়া চৌধুরী তখন ইডেন কলেজের বিএসসির চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। তার নেতৃত্বে দেয়াল টপকে মিছিলে যোগদান করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় উপস্থিত হয়ে ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনে মিছিল করে জয়নাব রোড, নবাবপুর, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, সদরঘাট, মিটফোর্ড রোড হয়ে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসতাম। এখানে এসে মধুদার বাঁশ ও টিনের ঘরের ক্যান্টিনে বসে ছোট একটা রসগোল্লা ও নিলাভ সবুজ গ্লাসে পানি খেয়ে পরম তৃপ্তিতে বাড়ি ফিরতাম। এই মিছিল চলার সময়ে টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ, কখনও গুলি, কখনও আহত-নিহতের ঘটনাও ঘটত। আহতদের নিয়ে মেডিকেলে যাওয়া, নিহতদের গায়েবে জানাজা করার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটত। এই আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়েই আমি ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় অনার্স শেষ করলাম। ততদিনে আন্দোলন-সংগ্রাম বেগবান হয়ে উঠেছে।
আমি উইমেন্স হলে, পরে রোকেয়া হলের ছাত্রী সংসদের কার্যকরী সদস্য, সহসম্পাদক ও ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হলাম পরপর। পদার্থবিদ্যার এমএসসি ক্লাসে ভর্তির পর ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি নির্বাচিত হলাম। আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বেড়ে গেল। এর মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করলেন। এই ছয় দফাকে নিয়ে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত অসংখ্য জনসভা করলাম। বঙ্গবন্ধু জেলে থেকেও এসব খবর রাখতেন। সেখান থেকে কিছু কিছু নির্দেশনাও পাঠাতেন। এ ছয় দফার ভিত্তিতে বাঙালিরা স্বাধীন আবাসভূমির স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।
১৯৬৮ সালের প্রথম দিকে ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ছয় দফার জন্য ডাকসুর ভিপি হিসেবে সভাপতিত্ব করলাম। এ সভা সর্বদলীয়ভাবে করা হয়েছিল। সেই জনসভায় ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, পংকজ ভট্টাচার্যসহ ছাত্রলীগের আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রউফ ও অন্য নেতারা বক্তৃতা করেন। এই সভাকে কেন্দ্র করে আমাদের আটজনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলো। আমরা কয়েকজন গ্রেপ্তার হলাম। আন্দোলন-সংগ্রাম চলতে থাকল। আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দিল। ছাত্র-জনতার আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হলো। বাধ্য হলো পদত্যাগ করতে। এর পর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হলো না। ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ শুরু করল।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস-আদালত এবং ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজ বর্জন শুরু করল। এদিকে আলোচনার নামে প্রহসনের ভেতর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র আসতে শুরু করল। গণহত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে লাগল। এরই মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে ১৯ মিনিটের এক অলিখিত ভাষণ দিলেন। এ বক্তৃতার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকনির্দেশনা পুরো জাতি পেয়ে গেল।
ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে প্রহসনের বৈঠকে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ার পর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ৩০ লাখ বাঙালির আত্মদান ও চার লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পেলাম। আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল সেদিন মেজর জেনারেল নিয়াজির ৯২ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণের দৃশ্য দেখার। এ আমার জীবনের অন্যতম পাওয়া।
সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তখন বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের সামরিক সরকার। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে এলেন। সেদিন সমগ্র ঢাকা শহরের আবালবৃদ্ধবনিতা বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করলেন এবং বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে শুরু করলেন। প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণসহ নানা ধরনের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড শুরু করলেন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করলেন। যার মূল স্তম্ভ ছিল চারটি- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। সংবিধানের আলোকে দেশকে গড়ার জন্য নানা পদক্ষেপ নিলেন তিনি।
দেশ স্বাধীনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করল। মাত্র সাড়ে তিন বছরে দেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। পঁচাত্তরের সেই হত্যাকাণ্ডের পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করল, তারা ২১ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তান বানানোর নানা অপপ্রয়াস চালিয়ে গেল। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সদম্ভে নিজেদের হত্যাকারী বলে ঘোষণা দিল, তাদের জিয়াউর রহমান নানাভাবে পুরস্কৃত করলেন। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ করে এই হত্যার বিচার বন্ধ রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন।
পরে আমরা দেখলাম, জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া মিথ্যাভাবে তার জন্মদিন পালন করে গেলেন দীর্ঘদিন। এ আমাদের চরম দুর্ভাগ্য। জাতি যেন ভুলে না যায়, তাদের এই চরম অপপ্রয়াস। যে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে একদিন সমগ্র জাতি উদ্দীপ্ত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই ভাষণ রেডিও ও সংবাদপত্রে প্রচার করা নিষিদ্ধ হয়েছিল। এখন দিন বদলেছে। এখন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা রাষ্ট্রক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার নানা অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কেউ গৃহহীন থাকবে না, বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম, পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা বিস্তারে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কৃষি, শিল্প, খাদ্য উৎপাদন ও নারী শিক্ষায় দেশ এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে।
সবশেষে বলতে চাই, আজকে এই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশে-বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। তাই স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আজকের তরুণদের দায়িত্ব স্বাধীনতা রক্ষার। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হবে। আমি চাই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার ক্ষেত্রে যার যার অবস্থান থেকে সৎভাবে, দেশপ্রেমিক ও নির্লোভ হয়ে সবাই কাজ করবে। এই সমাজে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি, অর্থ পাচার, মাদকের ব্যবহার বন্ধ হোক এবং গণতন্ত্র চর্চা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এই আমার প্রত্যাশা।
লেখক :ডাকসুর সাবেক ভিপি (১৯৬৬-৬৭), একুশে ও বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত, সভাপতি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ শিক্ষক ফেডারেশন ও পেশাজীবী নারী সমাজ, চেয়ারপারসন খেলাঘর।


বিষয় : গণতন্ত্র চর্চা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক

মন্তব্য করুন